• ১৯ কার্তিক ১৪৩৩, রবিবার ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ই-পোর্টাল

Janatar Katha

Banner Add
  • কলকাতা
  • রাজ্য
  • দেশ
  • বিদেশ
  • রাজনীতি
  • খেলার দুনিয়া
  • বিনোদুনিয়া
  • সম্পাদকীয়
  • নিবন্ধ
  • ভ্রমণ
  • রাশিফল
  • টুকিটাকি
  • চিত্রহার
  • বিবিধ
  • ভিডিও
  • এছাড়াও
    • উৎসব
    • ব্যবসা
    • স্বাস্থ্য
    • শিক্ষা
    • প্রযুক্তি
    • হেঁসেল

Tours. Travel

নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) পঞ্চম পর্ব

পরের দিনের আমাদের গন্তব্য ছোট্ট শহর লাক্সর। এই শহর টি কায়রো থেকে প্রায় ৭০০ কি.মি দূরে।আমরা প্লেনে করে এখানে চলে এলাম।তাই সময় বেশ কম লাগলো। মিশরের অন্তর্দেশীয় ফ্লাইটের জন্য যে প্লেন গুলো চলে, তার symbol দেখলেও অবাক হয়ে যেতে হয়। মিশরীয়দের প্রিয় হরাস দেবতার চোখ আঁকা থাকে। এই হরাস একে দেবতা তায় আবার বাজ পাখি, তাই উচ্চতার সাথে উড়ান দিতেও এর জুড়ি মেলা ভার। এর জন্যই মিশরকে এত ভালো লাগে। এরা সূক্ষ্মতার উপর জোর দেয় বেশি। লাক্সর শহরের এয়ার পোর্ট টি খুব সুন্দর। ছোট্ট হলেও খুব পরিষ্কার আর রুচি সম্মত। এখানে এলেই বোঝা যায় , যে আমরা মিশরীয় সভ্যতার একদম কেন্দ্র স্থলে চলে এসেছি। এখানে আমরা একটি বোট এ থাকব। দু দিন এখানেই ঘুরব। তারপর নৌকা চলতে থাকবে। আর যতক্ষণ এ নৌকা দাঁড়িয়ে থাকবে ততক্ষণ নীল নদের উপরেই, তার পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকবে।লাক্সর এর পুরনো মিশরীয় নাম হল থীবস। শহরের ঝকঝকে ভাব না থাকলেও মাটির গন্ধ ভাল ভাবেই রয়েছে। আর এটিই হল লাক্সরের বিশেষত্ব। আর মিশরের সব বড় শহরের মত এখানেও, তার প্রাণ কেন্দ্রটি হল নীলনদ। নীল নদের দুই পাড়ে প্রচুর ক্ষেত, আর বড় বড় গাছ। আগে প্রতি বছর নীলনদে যে বন্যা হত, সেই বন্যার ফলে তৈরি হওয়া প্লাবন ভূমিতে চাষ করা হত, আর এখনও তাই হয়। মিশরীয় ভাষায় এই উর্বর মাটিকে বলা হয় কেমেত বা Kemet (land of black soil), আর বাকি মরুভূমি অঞ্চল কে (যা মিশরের প্রায় ৯০%) বলা হয় Land of Red soil ।লাক্সর এসে দেখা গেল, মিশরীয় সেচ ব্যবস্থার চেহারা। আমরা যে রাস্তা দিয়ে চললাম তার পাশ দিয়ে বয়ে চলছিল নীল নদের একটি ক্যানাল। রাস্তার দুই দিকে কুঁড়ে বাড়ি, যা আমাদের দেশের কথাই মনে করায়। তবে কুঁড়ে বাড়ির ছাদটি অন্যরকম। ওদের দেশে ছাদ সমান, আমাদের মত আটচালা style ওখানে নেই। চারিদিকে খেজুরের গাছ। গ্রামের ছোট বাচ্ছারা নিজেদের মধ্যে খেলাধুলা করছে। কখনও কখনও আমাদের উপস্থিতি তে অত্যন্ত বিরক্তও হচ্ছে।এখানে আমাদের থাকার জায়গা , নদীর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বড় নৌকা বা cruise। এটিকে নৌকা না বলে ছোটখাটো একটি শহর বলা উচিত। ঘর, বারান্দা, ছাদ, খাবার ঘর, club, দোকান সব পাওয়া যায় এখানে। ছোট একটা জাহাজের মত। আমাদেরটির নাম ছিল Nile Quest । প্রত্যেকে নিজেরদের ঘরে এসে দেখলাম এলাহি ব্যবস্থা। একটা ভাল হোটেলের ঘরে যা যা থাকে, এখানেও সে সবই আছে। এখানে শুধু মাত্র একটি বোট নয়, বেশ কিছু বোট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একটির পর একটি পার করে নিজেদের টায় আসতে হয়।ভুল করলে কিন্তু অন্যদের বোটে চলে যাবার সমুহ সম্ভাবনা।প্রতি ঘরে একটি করে জানলাও আছে নদীর দিক করে।তবে সেটি নৌকা চলার পর উপভোগ করা যাবে । প্রথমে তো সেই জানলা খলার চেষ্টা করে প্রায় ভেঙেই দিচ্ছিলাম , পরে বুঝলাম ঘরে A.C চলায় জানলা খোলা রাখা যাবেনা । দুপুরে এলাহি খাবার খেয়ে আমরা রওনা দিলাম কারনাক ও লাক্সরের মন্দিরের উদ্দেশ্যে।কারনাক মন্দিরকারনাক ও লাক্সর এর মন্দির দুটিই মিশরের পুরনো রাজধানী থীবস এ অবস্থিত। প্রাচীন মিশরকে সাধারণ ভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় । আপার ও লোয়ার মিশর বা উত্তর ও দক্ষিণ মিশর। আগে এই দুই ভাগ আলাদা আলাদা ভাবে বিচরণ করত, তাদের সব কিছু আলাদাই ছিল। পরে ফারাও মেনেস এই দুই ভাগ কে এক করেন ও সমগ্র মিশরের একটিই রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। এই ঘটনাকে ছবিতে প্রকাশ করা হয়েছে, আপার বা উত্তর মিশরের Symbol হল পদ্ম আর লোয়ার বা দক্ষিণ মিশরের symbol হল প্যপিরাস। এই দুই এর মিলনই হল দুই মিশরের মিলন। এর ছবি দেখলে আমাদের পুরানের সমুদ্র মন্থন এর গল্প বা তার ছবি কল্পনায় ভেসে ওঠে।কারনাক মন্দিরের প্রবেশর পথ, দু দিকে সারি দিয়ে ছাগল জাতীয় পশুর মূর্তিআমরা প্রথমে গেলাম কারনাক এর মন্দিরে। কারনাক মন্দির চত্বরটি অতিকায় এবং বহু বছর ধরে বানান। এখানে বিভিন্ন রাজা বা রানীর কীর্তি আলাদা আলদা করে বোঝা যায়। এঁদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলেন রামেসিস দ্বিতীয় বা Great Ramesis। এই মন্দিরে ঢোকার রাস্তার দু দিকে সারি সারি Ram বা বড় ছাগল জাতীয় পশুর মূর্তি আছে। আর সেই ছাগল গুলির প্রতিটির সামনে একটি করে ছোট আকারের রাজার মূর্তি আছে। যেন রাজাকে রক্ষা করছে এই পশুটি । রাজা বলে মনে হবার সম্ভাবনা কম ছিল, তবে শুধু হাত এর অবস্থান দেখে বোঝা যায় (অর্থাৎ, হাত দুটি অসিরিস এর মত করে রাখা) । এরপরের প্রশ্ন আসে, কোন রাজার এত মূর্তি গড়া হল? ঐতিহাসিকরা অনেক খুঁজে একটি মাত্র মূর্তির বুকে রাজার নামাঙ্কিত খারতুশ দেখতে পান। এই খারতুশ থেকে প্রমাণ হয় যে মূর্তি গুলি সব ই ফারাও রামেসিস দ্বিতীয়র।এই মূর্তিতেই রাজার বুকে চিহ্নিত খারতিশের মধ্যেই দ্বিতীয় রামেসিসের নাম পাওয়া যায়, খারতুশখারতুশ হল মিশরীয় একটি প্রতীকের মত। ডিম্বাকৃতি আকারের একটি ফলক মত। যার মধ্যে মিশরীয় ভাষায় কিছু বিশেষ নাম বা অর্থ কে লেখা হয়। আজকাল কার দিনে লেখার মধ্যে Highlight করার মত। এই বিশেষ জায়গা গুলতেই সাধারন ভাবে রাজার নাম লেখা থাকত। বিভিন্ন রাজার বিভিন্ন খারতুশ হত। আর কারনাকেও এই খারতুশ দেখেই রামেসিস এর নাম জানা গেছিল।এরপর আমরা একের পর এক চমক পেতে পেতে মন্দিরের ভিতরে যেতে শুরু করলাম। যত এগোতে লাগলাম, তত অবাক হওয়া বাড়তে লাগল। প্রতি কোনায় এমন সব জিনিস রয়েছে যে মনে হচ্ছিল কোন দিকে আগে যাব কোনটায় যাবনা। যাই হোক, শুরুতেই চোখে পড়ল পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট অবেলিস্ক। অবেলিস্ক হচ্ছে, পাথরের তৈরি একটি মিনার বা পিলার। সাধারণ ভাবে এক একটি অবেলিস্ক এক একটি গোটা পাথর থেকে তৈরি হয়। অর্থাৎ সব অবেলিস্ক ই এক একটি monolith। অবেলিস্ক গুলি বানাতে বানাতে যদি কোন ভাবে পাথরে ফাটল দেখা যেত বা ভুল কোন লেখা হয়ে যেত, তাহলে সেই পাথরের পিলারটি সম্পূর্ণ ভাবে বাতিল করা হত। অবেলিস্ক, রাজাদের নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা প্রক্রিয়া মাত্র। যত ক্ষমতাশালী রাজা, তত বড় অবেলিস্ক। অবেলিস্ক সাধারন ভাবে মন্দিরেই থাকত। প্রাচীন ভারতে যেমন মন্দিরের চূড়া বা মসজিদের মিনারকে লম্বা হতে দেখা যায়, তেমনি মিশরে অবেলিস্কের লম্বা হবার রীতি ছিল।এর কারণ অবেলিস্ক কে দূর থেকে দেখে পথ চলতি মানুষ বুঝতে পারবেন যে ওইখানে একটি মন্দির আছে, ফলে রাতে থাকার জায়গা ও খাবার দুই ই পাওয়া যাবে। প্রতিটি অবেলিস্ক কোন রাজা বা রানীকে উৎসর্গ করে তৈরি করা হত। তাঁদের সবার কীর্তি অবেলিস্কে লেখা থাকত।কারনাক মন্দিরে রানী হাতসেপ্সুত ও তাঁর বাবা থুতমস দ্বিতীয়ের অবেলিস্ক রয়েছে। রানী হাতসেপ্সুতের অবেলিস্ক টি আজও এত সুন্দর ও নিখুঁত যে মনে হয়, computer এর print করা মনে হয়। তিনি নিজের বাবাকে সম্মান দেখানোর জন্য, নিজের অবেলিস্কটি একটু ছোট করে তৈরি করেন। অবেলিস্ক গুলি সব গোলাপি রঙের granite পাথরের তৈরি।তাই প্রতিটিই একটু লালচে বা গোলাপি রঙের দেখতে। এই পাথরগুলি খুব সম্ভবত লাক্সরের কাছে আসয়ান বা Aswan থেকে নিয়ে আসা।অবেলিস্ক, কারনাক মন্দিরের ভিতরকারনাক মন্দির যখন তৈরি করা হয় তখন তার ছাদ ছিল। তবে আজ আর সে বর্তমানে নেই, তবে তার কিছু আভাস আজও পাওয়া যায়। ছাদ থাকায় মন্দিরে সরাসরি সূর্যের আলো প্রবেশ করার উপায় ছিলনা, তাই মন্দির দেওয়ালে জানলা করা হত। সাধারন ভাবে মরুভুমি অঞ্চলে বাড়িতে জানলা থাকেনা, তাই কারনাক এর মন্দিরের গায়ে জানলা থাকায় আলো আসার কথাটিই মাথায় আসে। সেই জানলা আজ ও বর্তমান। আর এই জানলাগুলি ছিল অনেক উঁচুতে ফলে আশা করা যায় শুধু আলর জন্যই এগুলি বানানো।এই মন্দিরে বিশাল আকৃতির পিলার দেখতে পাওয়া যায়। তার প্রতিটির মাথায় বিভিন্ন কারুকাজ করা। এই উঁচু পিলার গুলির জন্যই এই মন্দিরকে hypostyle pillar temple বলে। তবে এটিকে শুধু মন্দির না বলে মন্দির গুচ্ছ বলা উচিত।কারনাক মন্দিরে, পিলারের উপরে রঙিন হিয়েরগ্লিফ লেখা।এই মন্দিরের দেওয়ালে, পিলারে বা ছাদে ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় রঙ্গিন ছবি আঁকা ছিল। আজও কিছু অংশে সেই সব ছবি কিছুটা হলেও দেখা যায়।অপূর্ব সব প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার । যা আজ থেকে প্রায় ৪০০০ হাজার বছর আগে আঁকা হলেও অমলীন। আর প্রতি পিলারে হিয়েরগ্লিফের লেখা। এ সব দেখে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে যে, মিশরীয়রা এত কি লিখেছিলেন? এত কি কথা থাকতো বলার জন্য।ছাদের অংশ বিশেষ এতটাই উঁচুতে যে ক্যামেরা বন্দি করা প্রায় অসম্ভব। তবুও চেষ্টা করে গেছি। আর খালি অবাক হয়েছি যে এত সুন্দর রঙের ব্যবহার ওঁরা শিখল কথা থেকে। কি করে বুঝল যে এই সব রঙ লাগালে তা থাকবে হাজার হাজার বছর। জানি না, তবে প্রশ্ন থেকেই যায় মনের মধ্যে।এই সব দেওয়াল চিত্র বা hieroglyph এর মধ্যে একটি চিত্র বার বার চোখে পরতে লাগল । একটি হাঁস জাতীয় পাখির উপর লাল রঙের গোল সূর্য । মিশরীয় ভাষায় যাকে বলে সা-রা (Sa-Ra) । যার প্রকৃত অর্থ Son of God Raa বা সূর্য দেবের পুত্র।প্রাচীন মিশরের প্রধান আরাধ্য দেবতা ছিলেন সূর্যদেব বা রা। তাই মিশরের রাজারা সবাই নিজেদের সেই দেবতার পুত্র বলে পরিচয় দিতেন। এই ধরনের অভ্যাস বোধহয় পৃথিবীর সব সভ্যতাতেই দেখা যায়। যেমন ভারতে সম্রাট অশোক নিজেকে দেবতার প্রিয় , শ্রী প্রিয়দর্শী (Devanam piya , Piyadassi) বলেছেন। বা পরবর্তী সময়ে আরও অনেক সম্রাটদেরই এই রকম পদ্ধতি গ্রহন করতে দেখা যায় । এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাহল, এর দ্বারা রাজারা প্রজাদের কাছে নিজেদের গ্রহন যোগ্যতা তৈরি করতেন।এই মন্দিরের ভিতরে একটি বড় জলাশয় আছে। মরুভুমির মাঝে অত বর জলাশয় দেখে বঝা যায় যে রাজারা প্রজাদের খেয়াল রাখতেন। এই জলাশয়ের পাশে একটি বড় পাথর আছে , যার আকার খানিকটা Scurb বা মিশরীয় দেবতা খেপরীর মত। লোকমত অনুযায়ী এই খেপরী কে ছুঁয়ে যদি ৭ বার ঘোরা যায় তাহলে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়, কারন খেপরী হলেন মিশরীয়দের ভাগ্য দেবতা। এর জন্যই যে কোন সমাধি ক্ষেত্রে খেপ্রির ব্যবহার চোখে পরার মত। এর সাথেই দেখা যায় বড় বড় চওড়া দেওয়াল, যাতে অপূর্ব কারুকাজ করা বা লেখা। আসলে মিশরীয়দের হিয়েরগ্লিফ লেখা গুলি ত ছবির মতই দেখতে, তাই কারুকাজ, না ছবি, না লেখা বুঝতে ভুল হয়ে যায়। আর আশ্চর্য হই এই ভেবে যে লৌহ যুগের আগে কিভাবে এত নিখুঁত কাজ করা সম্ভব।কারনাক মন্দিরের দেওয়ালএরপর আমরা পৌঁছলাম লাক্সর মন্দিরে। বর্তমান শহরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এই মন্দির আর মনে হচ্ছে যেন প্রাচীন ও আধুনিক যুগের মধ্যে যোগাযোগ সুত্র তৈরি করছে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই এক টানে নিয়ে যাবে ৪০০০ বছর আগে।চোখের সামনে ভেসে উঠবে ফারাওদের সময়কাল। আসলে মিশরে বেড়াতে আসার পুরোটাই যেন Time Machine এ চড়ে ঘুরে বেড়ানো। আর সেই যাত্রায় সাহায্য করবে পাশ দিয়ে বয়ে চলা নীল নদ।লাক্সর মন্দির সন্ধ্যের আলোয়এই মন্দিরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম একটি রাস্তার মত অংশ সদ্য আবিষ্কৃত হয়ে পরে রয়েছে। জানলাম এই রাস্তা টিকে বলা হয় স্ফিংক্স রাস্তা বা Sphinx Avenue। এই রাস্তার উপর এখনও ঐতিহাসিকরা কাজ করছেন। রাস্তাটির দুই পাশে আজ অবধি ২৪৮ টি স্ফিংক্স এর মূর্তি পাওয়া গেছে এবং খনন কাজ এখনও চলায় আরও পাবার সম্ভবনা আছে। জানা গেল যে প্রাচীন কালে কারনাক ও লাক্সরের মন্দির দুটি এই রাস্তা দিয়ে যুক্ত ছিল। বছরে একবার উৎসব হত ১৪দিন ধরে। অনুষ্ঠান শুরু হত কারনাক এর মন্দিরে আর শেষ হত লাক্সরে। এই রাস্তা দিয়েই তখন উৎসবের মিছিল চলত। কিন্তু বর্তমানে এর অনেকটা অংশ ঢাকা পরে গেছে, ফলে তার উপর বাড়ি, শহর মানুষজনের বসতি শুরু হয়ে গেছে আর মানুষ ভুলে গেছে এই রাস্তার কথা। হয়ত হাওয়া তে কান পাতলে এখন উৎসবের শব্দ, ছেলে মেয়েদের হাসি শোনা যাবে, তবে আজ আর তাদের কথা শোনার সময় নেই কারোর। নিজেদের স্মৃতি নিয়ে একাই বসে আছে স্ফিংক্সগুলি।মন্দিরে ঢোকার আগেই একটা ছোট মন্দির দেখলাম। একজন দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু মূর্তির মাথা নেই। দেবীর পোশাক দেখে মনে হয় যে কোন গ্রীক বা রোমান দেবী। শুনলাম দেবী হলেন Aphrodite, গ্রীকদের সৌন্দর্য ও বিদ্যার দেবী। এটি দেখে বোঝা যায় যে, রোমানরা এই অঞ্চলে এসে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছিলেন। মিশরীয় শিল্পের সাথে মিলিয়ে তাদের শিল্পকেও স্থান দেবার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে খুব একটা সফল হতে হয়েছিলেন সে কথা বলা শক্ত।লাক্সর মন্দিরের ভিতরলাক্সরের মন্দিরেও রামেসিস দ্বিতীয়র অবদান খুব স্পষ্ট। এই মন্দিরের ভিতরে একটি মসজিদ আছে। এটি বহু পুরনো, যবে থেকে আরবরা এই অঞ্চল দখল করেন, সেই সময় থেকে এটি আছে। আজও সেখানে প্রার্থনা হয়। আমাদের সামনেই শুরু হল সন্ধ্যের আজান। তৈরি হল এক অদ্ভুত অনুভুতি। বাড়ি থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে, সুদূর মিশরে, নীল নদের ধারে ৪০০০ বছর পুরনো লাক্সর মন্দিরে বসে সূর্যাস্ত দেখা আর সাথে মিঠে আজানের সুর। একেই বোধহয় বলে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের উদাহরণ । পরিবেশ টা হয়ে উঠল মহময়ী। সূর্যাস্তের কমলা আভা সারা আকাশ জুড়ে, আর পূব আকাশে আঁধারের ঘোরে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে বাঁকা চাঁদ। পাশের নীল নদ সন্ধ্যের কমলা কালো রঙ মেখে বয়ে চলেছে নিজের ঠিকানায়। সেই মুহূর্তে শতাব্দী প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার মন্দির, যাকে পারথেনন বলেও ভুল হয়, সেখানে আজানের সুরে আর পাখির গানে সন্ধ্যে নামছে। আর সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক সাথে গ্রীক-রোমান, মিশরীয়, ইসলামীয় আচারের মিশ্রণ। কি যে অদ্ভুত এই মিশ্রণ সে না দেখলে বোঝা যাবেনা।লাক্সর মন্দির আমন দেব ও তাঁর স্ত্রী দেবী মুট এর জন্য উৎসর্গিত। এই মন্দিরের মধ্যে ফারাও তুত-আঙ্খ-আমন ও তাঁর স্ত্রী আঙ্খ-সে- আমন এর মূর্তি দেখলাম। মূর্তি দুটি মার্বেল পাথরের তৈরি, তবে সমান উচ্চতার। এর থেকে বোঝা যায় যে রাজা অত্যন্ত উদার মনের। কারন মিশরে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ বলে রাজা ও রানীর মূর্তিতেও উচ্চতার ফারাক রাখা হত। রানীর মূর্তি হত উচ্চতায় ছোট আর সাধারণ ভাবে রাজার পাশে রানীর বসার ব্যবস্থা থাকতনা।এই মন্দিরে খুব স্পষ্ট দেবী Sashet এর মূর্তি দেখলাম। এই দেবী মিশরীয়দের বিদ্যা আর কারিগরি বিদ্যার দেবী। খানিকটা ভারতীয় দেবী সরস্বতীর মত।এখানে দেখলাম রামেসিস দ্বিতীয়র মূর্তির পিছনে তাঁর অবেলিস্ক টি, মূর্তিটিকে যেন সহায়তা করছে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। মন্দিরের ভিতরের অংশে রঙ দিয়ে আঁকা ছবি দেখা গেল। কিছু ছবিতে, ইউরোপীয় ধাঁচ লক্ষ্য করা যায়। বোঝা যায় যে রোমানরা এখানে এসে এদের ধর্ম কে মুছে ফেলতে চেয়ে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার করতে চেয়েছেন। তবে কত টা সফল হয়েছে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। শিল্প ও ধর্মের ক্ষেত্রে এই অদ্ভুত আচরণ সারা পৃথিবীতেই বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়। মানুষ হয়েও এত বর্বর আচরন ভাবা যায়না। বা হয়ত বলা উচিত মানুষ বলেই এতটা অনাচার করতে পেরেছে ও সহ্য করতেও পেরেছে। তবে আজ আমরা একে যেভাবে দেখছি, সেটি একটি অন্য এক রূপ প্রকাশ করছে। মিশরীয় দেবতার মন্দিরে একদিকে মসজিদে শোনা যায় আজানের সুর, অন্যদিকে যীশু উঁকি দেন দেওয়ালের ফাঁকে। দেবতায়- ঈশ্বরে কোন ভেদ নেই, ভেদাভেদ শুধু মানুষের মনে, আর মনের মধ্যে। তাই বোধহয় দেবতারাও আজ মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছেন আমাদের থেকে।কিছু সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ফিরে এলাম আমাদের নৌকাতে। মনের মধ্যে শুধু জ্বলতে থাকল লাক্সার মন্দিরের ভিতরের পরিবেশ। মনে হতে লাগল, যদি হতে পারতাম ওদের দলের একজন, থেকে যেতাম এই শহরেই, জীবনের বাকি অংশটা কাটিয়ে যেতাম।

ডিসেম্বর ০৩, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) চতুর্থ পর্ব

আগের রাতের ফালাফেল আর কোশারি খেয়ে রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি ফারাও খুফুর কাছে কাজ করি। আমায় তাঁর পিরামিড বানানর কাজে লাগান হয়েছে। শয়ে শয়ে শ্রমিক কাজ করে চলেছে। ঠিক যেমন Cleopetra ছবিতে দেখান হয়েছিল। আমাকে কি সব শক্ত অঙ্ক করার কাজ দেওয়া হয়েছে, যথারীতি সেটি না পারায় ক্ষুব্ধ খুফু আমার মৃত্যু দণ্ড দিচ্ছেন। এই অবধি দেখেই ভয়ে চোখ খুলে গেল। আর দেখলাম সকাল হয়ে গেছে, বুঝলাম গত রাতে খাবারটি একটু গুরুপাকই হয়েছিল। ভেবে হাসিও পেল আর একবার তখন ইচ্ছেও হল খুফুর সমাধির সামনে গিয়েই না হয় আরেকবার দাঁড়ানো যাক।যা ভাবা তাই কাজ, সকালের আলোতে পিরামিড দেখব বলে চলে গেলাম গিজা চত্ত্বরে। এই বারে অনেক বেশি সময় নিয়ে গেলাম। তবে দ্বিতীয় বারেও উৎসাহ কম হলনা। এবারে খুফু পিরামিডের উপর খানিকটা উঠলাম। যেখান দিয়ে এখন পর্যটক রা ভিতরে যেতে পারেন। তবে এতি মোটেও পিরামিডটির আসল দরজা নয়। এটি বোধকরি ডাকাত বা পিরামিডের লুটেরারা বানিয়েছিল। আসল দরজা অনেকটা উপরে । সেখান পর্যন্ত পৌঁছন বেশ কঠিন। ভাবতে অবাক লাগে যে ওই সময়ে কি করে এত বড় একটা পিরামিড বানাল । আর এটা দেখতে দেখতেই মনের মধ্যে প্রশ্ন পাক খেয়ে ওঠে, যে এত বড় একটা সৌধ সেই সময়ে বানানর জন্য বহু পরিমানে শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। আর খুব অত্যাচারী রাজা না হলে সেই বিশাল সংখ্যক শ্রমিক কে পরিচালনা করাও সম্ভব নয়। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজা খুফু অত্যাচারী ছিলেন।ফারাও খুফুর পিরামিডএরপর আমরা খুফু পিরামিড এর পাশেই তিনটি সোলার বোট রাখার জায়গা দেখতে গেলাম। এর প্রতিটির আকার একদমই নৌকার মত । যা থেকে বোঝা যায় যে ওখানে নৌকাই রাখা হত। তবে এই নৌকা গুলির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সেগুলিকে সংরক্ষন করা যায়নি, শুধু মাত্র একটিকে, একটি জাপানী সংস্থা নিয়ে গেছে সংরক্ষন এর চেষ্টায়। খুফু পিরামিডের পিছনেই তিনটি রানিদের পিরামিড আছে। সেগুলির অবস্থা যদিও খুব ভাল নয়, তবুও তার একটির মধ্যে আমরা ঢুকলাম।গিজা চত্ত্বরে রানীদের তিনটি পিরামিদ। প্রায় ভেঙ্গে পরেছে, তাও ভিতরে যাওয়া যায়এগুলিতে ঢোকার জন্য আলাদা টিকিট লাগেনা। এগুলিও এই চত্ত্বরের বাকি পিরামিডগুলির মত ফাঁকা। তবে এর ভিতরে যাবার পথ টি বেশ কঠিন । পথ টি খুব সরু আর অনেকটা নীচে নামতে হয়। নীচে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা, সেখানে গেলে বোঝা যায় যে সেটি পিরামিডের ঠিক মাঝের অংশ। এখানে একটি বেদী মত করা আছহে যেখানে মমি কে রাখা হত। সেই জায়গায় দাঁড়াতে কেমন যেন মনে হল স্বর্গ থেকে রানী নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন তাঁর সমাধিতে আমাদের প্রবেশ।এর পাশেই রানী নেফেরথারির মন্দির রয়েছে । আমরা সেখানে গেলাম। এই মন্দিরে বেশ কয়েকটি ঘর রয়েছে। নেফেরথারি, পুরনো সাম্রাজ্যের একজন প্রধান রানী ছিলেন।মনে হল, যে সব রানীদের পিরামিডগুলি দেখলাম, তার মধ্যে রানী নেফেরথারির পিরামিড নিশ্চয়ই থাকবে। তবে কোন লিখিত কিছু নেই বলে হয়ত বোঝা যাচ্ছেনা।এরপর আমরা আবারো ফারাও খাফ্রেনের পিরামিড এর কাছে গেলাম। এই পিরামিডের সামনেই আছে রাজার mortuary temple । এই মন্দির এর পুরটাই প্রায় ভেঙ্গে গেছে, তবে অতীত এর সাক্ষী রূপে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় বড় পিলার গুলো। যখন এর বিশালত্ত্বে অবাক হচ্ছি, তখন শুনলাম যে এই মন্দির বানানোর সময় আগে পিলার গুলি বানিয়ে নেওয়া হত। তারপর পিলার এর মাথা পর্যন্ত বালি দিয়ে ভর্তি করে দেওয়া হত । বালি ভরতি অবস্থায় মন্দিরের ছাদ ঢালাই করা হত। ছাদ শক্ত হয়ে গেলে ভিতরে জমানো বালি সরিয়ে নেওয়া হত। অভিনব পদ্ধতি। আজকের দিনে যেমন ভাড়া বেঁধে ঢালাই হয়, তার ই প্রাচীণ পদ্ধতি মনে হল। তবে এটা ঠিক যে এই সমস্ত কাজের জন্য বিপুল পরিমানে লোকবল থাকা প্রয়োজন। এর থেকেই বোঝা যায় যে মিশরীয় রাজারা প্রচুর সংখ্যায় ক্রীতদাসকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করত।ফারাও খাফ্রেন এর Mortuary Templeএরপর আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম সেই স্ফিংক্স এর সামনে। আগের দিন বিকেলের আলোতে ওঁর পুরো গরিমা ঠিক বুঝতে পারিনি। আজ পারলাম। এই স্ফিংক্স ই সগর্বে ঘোষণা করেন , I have seen Alexander, I have seen Ceaser, and Napoleon । কি সাংঘাতিক ঘোষণা, তবে প্রতিটি কথাই সত্যি। মিশরীয় মতে এই স্ফিংক্স এর ক্ষমতা প্রচুর।তাই জন্যই সব রাজা বা ক্ষমতাশালী রানী দের স্ফিংক্স মূর্তি পাওয়া যায়। আর পিরামিডের সামনে এর অবস্থানের কারণ হতে পারে পিরামিড কে সুরক্ষিত রাখা। তবে বর্তমানে বোঝা যায় যে রক্ষা করার কাজ টি স্ফিংক্স পারেন নি। কারণ সেখানে বাজে বুদ্ধি সম্পন্য মানুষের দৃষ্টি পরেছিল। এই গ্রেট স্ফিংক্স , রাজা খাফ্রেন এর মুখের আদলে তৈরি হয়েছিল । তবে পরবর্তী সময়ে স্ফিংক্স এর গর্ব কে চূর্ণ করার জন্য কোন এক রাজা তাঁর নাক ও মাথার মুকুট ভেঙে দেন । কিন্তু তাতে কি, সেই রাজা কে আজ হয়ত ইতিহাস বা মানুষ কেউ মনে রাখেনি, রেখেছে স্ফিংক্স কে। আর যত দিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, ততদিন মানুষ তাঁকেই মনে রাখবে। ইতিহাসের যেন জ্বলন্ত সুত্র এই স্ফিংক্স । শোনা যায় ব্রিটিশরা মিশরে কাজ করার সময়ে নাকি স্ফিংক্স এর নাক টি খুঁজে পান। তারপর সেটি ইংল্যান্ড এ নিয়ে যান ও বর্তমানে সেটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে।গ্রেট স্ফিংক্সস্ফিংক্সকে শেষ বারের মত কুর্নিশ করে আমরা বিদায় নিলাম। প্রতিজ্ঞা করে এলাম যে আবার ফিরে আসব। হতে পারে তার জন্য বছর বছর অপেক্ষা করতে হল। তবে তাতে কি, তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য কোন সময়ই বেশি নয়। আর ফিরে আমায় আসতেই হবে।শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ২৬, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) তৃতীয় পর্ব

পরের দিনের প্রথম গন্ত্যব্য হল Cairo Museum। সত্যি কথা বলতে এত বড় মিউসিয়াম আমি আগে দেখিনি। শুনলাম এই মিউসিয়াম ভাল ভাবে পুরোটা দেখতে হলে প্রায় এক সপ্তাহ লাগবে। অত সময় আমাদের নেই, বোধকরি আমাদের মত যারা এখানে বেড়াতে আসেন তাদের সবার ক্ষেত্রেই এক সমস্যা ঘটে। তাই আমাদেরও ইচ্ছে যে অল্প সময় যতটা বেশি দেখে নেওয়া যায়। এই মিউসিয়াম ১৫০ থেকে ২০০ বছরের পুরনো। এটি দুটি তলায় ভাগ করা। নীচের তলায় সময়কাল ধরে (period wise) ঘর সাজানো রয়েছে, যেমন Old Kingdom, Middle Kingdom, New Kingdom ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় তলায় ঘর সাজান হয়েছে বিভিন্ন বিষয় অনুযায়ী, যেমন sarcophagus room, animal mummy room ইত্যাদি। তার মধ্যে দুটি ঘর হল বিশেষ আকর্ষণীয়, - Pharao Tut-Ankh-Amun এর ঘর, আর Royal Mummy room।কায়রো মিউজিয়ামমমি রুম ভাবতেই মনে পড়ে গেল, একটি বই এ পড়া সেই বিচিত্র অংশটির কথা। তখন ১৯ শতকের সময়। মিশর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ।সেই সময় থেকেই মমির খোঁজ চলছে। রাজা বা ফারও দের মমি না হলেও যে রকমই মমি হোক না কেন তাকে সমাধি থেকে বের করে আনা হচ্ছে, পরীক্ষা করা হবে এই অজুহাতে। জাহাজ ভর্তি মমি ও অন্যান্য সামগ্রী চলে যাচ্ছে ইউরোপ। প্যারিসেও যেত মমি সেই সময়। প্যারিসের বিভিন্ন বাড়িতে সেই মমিকে দেখার জন্য টিকিট কাটা হত। যেন সার্কাস হচ্ছে। ভাবলেই কেমন মনে রাগ জন্মে যে, অসহায় একটি মমি, সে যে মানুষেরই হোক না কেন, শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে আছে, তাকে সবার সামনে দেখানটাই যেন ছিল গর্বের। আবার ইংল্যান্ডে যৌবন ধরে রাখার জন্য কোন মানুষ নাকি বিচার দিয়েছিলেন মমি গুঁড় করে ট্যাবলেট বানিয়ে খাবার। তাই হাজার হাজার মমি ইংল্যান্ড নিয়ে আসতো, তাদের গুঁড়ো করা হত আর বিভিন্ন লতাপাতা মিশিয়ে বড়ি বানিয়ে খেত। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে কি পরিমানে ইতিহাসের অবলুপ্তি ঘটেছে সেই সময়, আর কি পরিমান কুসংস্কারে ভরা ছিল তখনকার ইউরপীয়দের মন। কি ভাবে সমস্ত সুত্র কে নষ্ট করা হয়েছে শুধুমাত্র মজার খাতিরে। যেমন নষ্ট হয়েছে আমাদের সাঁচি স্তুপ বা অমরাবতি স্তুপ। তাতেও শিক্ষিত ইউরোপিয়ানরা যা সংগ্রহ করেছেন, তা এই মিউসিয়ামে আছে। মমি রুম এ যাবার আগে তাই বার বার এই কথা গুলোই মনে পড়ছিল।মিউসিয়ামে ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়ে রসেত্তা পাথরটি। এই পাথরটি খুব সাধরন দেখতে কিন্তু এর ক্ষমতা সত্যি ই অসাধারন। তবে কায়রো মিউজিয়ামে যেটি আছে,সেটি একটি replica, আসল পাথরের অংশটি লন্ডনে আছে। এর গল্প হয়ত অনেকেই জানে। আর যারা জানেনা তাদের জন্য বলি, এই পাথরটি প্রথম আবিষ্কার হয় ১৭৯৯ সালে। সেই সময়ে ফ্রান্সের সম্রাট নেপলিয়ান মিশরে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁরই এক সৈন্য এটি খুঁজে পায়। এটি হয়ত তখন রাশিদ বা রসেত্তা নামের একটা শহরের কোন মন্দিরের দেওয়ালে পিলার হিসেবে ছিল। খেয়াল করে দেখা যায় সেখানে কোন একটি বিশেষ বার্তা তিনটি ভাষায় লেখা আছে। প্রথমটি মিশরীয় হিয়েরগ্লিফ, তারপরে দেমতিক (Demotic) আর শেষে গ্রীক। এই পাথরটি আবিষ্কার হবার পরই মিশরের ভাষা কে পাঠ করার চেষ্টা শুরু হল। ফ্রান্সের পর এই অঞ্চল যখন ব্রিটিশদের দখলে আসে তখন তারা এই পাথর নিয়ে লন্ডন চলে যান। আর সেখানেই পাঠোদ্ধার পর্ব শুরু। আর সেই দিন থেকে মানে ১৮০২ সাল থেকে ওই পাথর লন্ডনে আর ১৮২২ নাগাদ একজন ফ্রেঞ্চ লিপি বিশারদ পাঠোদ্ধার সম্পূর্ণ করেন। এই মিউসিয়ামে তার একটা replicaআছে, আরও একটা replica, আলেক্সান্দ্রিয়া তে রাখা আছে, যে অঞ্চল থেকে আসলে এই পাথরটিকে খুঁজে পাওয়া যায়।রসেত্তা পাথরে তিন ভাষার লিপিফারাও Tut-Ankh-Amun এর জন্য একটি বিশেষ ঘর আছে, সেই ঘরটিতে ছবি তোলা নিষেধ। সেই ঘরটিতে Howard Carter এর খুঁজে পাওয়া প্রায় সব জিনিসই আছে। শুধুমাত্র ফারাও এর মমি করা দেহ আর তার একটি কফিন বা সারকাফাগাস রয়ে গেছে আসল সৌধ তে, যা আছে Valley of Kings এ। এই বিশেষ ঘরটি ফারাও এর সৌধ থেকে পাওয়া ৪০৩০ টি জিনিস দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। ফারাও এর মমি করা দেহ থেকে ২০০ রকমের গয়না পাওয়া গেছে। সেগুলির বেশীরভাগই সোনা দিয়ে তৈরি। সোনার সাথে কিছু আধা-মুল্যবান (Semi-Precious) পাথর দিয়ে তৈরি। তার মধ্যে Carnelian বা Lapis Lazuli র ব্যবহার চোখে পড়ার মত। আমাদের হরপ্পা সভ্যতাতেও এই দুই পাথরের ব্যবহার বিশেষ ভাবে চোখে পরে, তার থেকে আবার আমরা এই সত্যে উপনীত হই, যে এই সমকালীন সভ্যতাগুলির মধ্যে যোগাযোগ ভাল ভাবেই রক্ষা করা হত। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও অবাক হয়ে যেতে হয় সেই সব গয়নার নকসা ও রঙ সমন্বয় দেখে। এই ঘরেই রয়েছে ফারাও তুত-আঙ্খ-আমন এর সেই বিখ্যাত সোনার মুখোস, যা ১১ কেজি সোনা দিয়ে তৈরি । এই মুখোস দেখলে সত্যিই মনে হয় যে রাজা তুত খুব অল্প বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। এ ছাড়াও আছে রাজার শেষ কফিনটি বা সারকাফাগাস। এটিও নিরেট ৩ টন সোনা দিয়ে বানান হয়েছিল। রাজার ব্যবহৃত দুটি ছুরি আছে, একটি সোনার আর একটি লোহার ।এই ছুরি দুটি নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, কারণ লোহা দিয়ে তৈরি ছুরি কি ভাবে লৌহ যুগের আগে পাওয়া যেতে পারে? এর কোন উত্তর সঠিক ভাবে জানা যায়না। কেউ বলে তখন লোহা ছিল, তখন প্রশ্ন জাগে তাহলে বাকি কোথাও তার ব্যবহার নেই কেন বা উল্লেখ ও নেই কেন? আবার কেউ বলেন পরে লৌহ যুগে কেউ আবার করে সমাধি খুলে সেই ছুরি রেখে আসেন। এও এক প্রকারে অসম্ভব, কারন মিশরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী সমাধিস্ত হয়ে গেলে সেই সমাধি আর খোলা হবেনা কারণ তাতে আভিশাপ লাগবে। আর যদি কেউ খোলে সে হবে সমাধি চোর। সে সব জিনিস রেখে আবার একটা নতুন অপূর্ব ছুরি রেখে সমাধি বন্ধ করে বেরিয়ে আসবেনা। কারণ কার্টার যখন সমাধি আবিষ্কার করেন তখন তার মধ্যে প্রায় সবই সাজানো ছিল আর এও বিশ্বাস করা হয় যে তা আগে কখনই বের করা হয়নি।ফারাও, তুত-আঙ্খ-আমন এর দুটি ছুরিএছাড়াও আছে রাজার রাজমুকুট, যেখানে উচ্চ মিশর ও নিম্ন মিশরের দুই রক্ষাকর্তা দেবতার মুখ বসানো। এরা হলেন একজন কোবরা সাপ ও অন্যজন শকুনি পাখি । এদের চোখ গুলি স্ফটিক দিয়ে বানানো, আজও এতটাই উজ্জ্বল যে মনে হয় আমার দিকেই তাকিয়ে আছে যেন। আর সেই দৃষ্টি যেন অত্যন্ত রোষ পূর্ণ। তীব্র রাগ জমা করা আছে সেই চোখ গুলির মধ্যে।রাজা তুত এর প্রতিটি আঙ্গুল সোনার পাত দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছিলো, এই ঘরে সেগুলিও শোভা পাচ্ছে। এর সাথে আছে রাজার বুকের উপর বসানো ছিল একটি সৌভাগ্যের প্রতীক, যা একটি গুবরে পোকার আদলে তৈরি । যাকে স্কারাব (Scarab) বা খেপ্রিও (Khepri) বলা হয়ে থাকে।Scarab বা Khepri, মিশরীয়দের সৌভাগ্যের প্রতীকএই ঘরের ঠিক বাইরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাজার সব কটি সারকাফাগাস। সব কটি সারকাফাগাস ই সোনার পাত দিয়ে মোড়া, ভিতরে হয় পাথর বা কাঠ দিয়ে তৈরি। আর একটি আছে নিরেট সোনার। যার ওজন ৩ টন। অসম্ভব সুন্দর দেখতে সেটি আর আজও সমান উজ্জ্বল।ফারাও, তুত-আঙ্খ-আমনের গয়না ও রাজমুকুটএ সবের সাথে আছে রাজার ব্যবহার করা একটি সোনার চেয়ার। চেয়ারটিতে সোনা ও আধা-মুল্যবান পাথর আর ফিয়ান্স (Fience an art material made from burnt silica and natural colours, specially used in ancient Egypt, Mesopotamia and Harappa) দিয়ে খোদাই করা এক অপূর্ব চিত্র। সেই চিত্রতে দেখা যাচ্ছে, রাজা তুত বসে আছেন আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর রানী আঙ্খ-সনামন। রানীর হাতে সুগন্ধীর পাত্র। হয়ত সেই সুগন্ধী রানী লাগিয়ে দিচ্ছেন রাজার গায়ে, পরম যত্নে ও ভালবাসায়। কি সুন্দর একটি ভালবাসার ছবি ধরা রয়েছে সেই চেয়ারটিতে। আজ সেই ছবির মানুষ দুজন কেউ ই নেই, একদিন ছিলেন, তবু তাদের ভালবাসার ছবি রয়ে গেছে, যুগ যুগান্তর ধরে।সোনার সারকফাগাসএর সাথেও আছে আলাবাস্টর পাথরের তৈরি ৪ টি ক্যানোপিক জার, যার মধ্যে রাজার দেহের কিছু অঙ্গ ভরে রাখা আছে, আর সেই জার গুলিকে পাহারা দিচ্ছেন স্বয়ং দেবী ইসিস।ফারাও তুত-আঙ্খ-আমনের সোনার চেয়াররাজার সব কটি সারকাফাগাস ভাল ভাবে বন্ধ করার পর সৌধ তে বসানো ছিল, একটি কালো পাথরের বেদীর উপর, কালো পাথর ও সোনা দিয়ে তৈরি আনুবিস বা শেয়াল দেবতা। এই দেবতা হলেন পরবর্তী জীবনে যাবার দেবতা। এই হল সত্যজিতের সেই শেয়াল দেবতা।ফারাও এর সোনার সারকফাগাসের মুখHoward Carter বলেছেন যে, রাজা তুত এর সৌধতে প্রথম বার প্রবেশের সময় হঠাৎ করে আনুবিসের এই মূর্তি দেখে তিনি এক রকম ভাবে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। আনুবিস, রাজার পরবর্তী জীবনে প্রবেশের পথ কে সুগম ও সুনিশ্চিত করতে পাহারায় বসেছেন। সেখানে তাঁর নির্দেশ অমান্য করে, কার সাধ্যি। তবে সেই সাহস যখন কার্টার দেখিয়েছেন, সেটি যেন মোটেই আনুবিস পছন্দ করছেন না।আলাবাস্টার পাথরের ক্যানপিক জারএরপর আমরা Royal Mummy Room গেলাম। এই ঘরে ঢোকার জন্য আলাদা টিকিট লাগে। এখানে বর্তমানে ১২ টি রাজবংশীয় মমি রাখা আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফারাও রামাসেস দ্বিতীয়, রানী হাতসেপ্সুট, বা ফারাও আমনহটেপ এর। প্রতিটি মমিই খুব সুন্দর করে সংরক্ষণ করা। কাঁচের লম্বা বাক্সের মধ্যে রাখা। বুক থেকে পা অবধি পাতলা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। কাপড়টি দিয়েই কোন কালে সেই মমি কে বেঁধে রাখা হয়েছিল, তার ফলে কাপড়টি বেশ মলিন হয়ে উঠেছে। এই ঘরে কথা বলা নিষেধ , ছবি তোলা ত বটেই। ঘুমন্ত রাজাদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য। এখানে ঢুকে একটা অন্য রকম অনুভূতি হয়। হাজার হাজার বছর আগেকার রাজা, সম্রাটরা আমার সামনে পরম শান্তিতে, পরম বিশ্বাসের সাথে ঘুমিয়ে আছেন। একদিন যারা সমগ্র মিশর রাজত্ব করেছেন, আজ আমার সামনে শুয়ে। ইতিহাসকে এভাবে কোনদিন চোখে দেখা সম্ভব, ভাবতে পারিনি। বিজ্ঞান ও ইতিহাস এর এত সুন্দর মেল বন্ধন দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। অবাক হবার ঘোর কাটতে একটু সময় লাগল। তারপর ঘর টি ঘুরে দেখতে লাগলাম।দেবতা আনুবিস, যিনি ফারাও তুতকে পাহারা দিচ্ছিলেনসব থেকে সুন্দর ভাবে আছে ফারাও রামাসেস দ্বিতীয়ের মমি। তাঁর সাদা চেহারা, সাদা চুল তাঁকে সত্যিই গ্রীক দেবতার সাথে তুলনা করাতে বাধ্য করে। সত্যি মনে হয় যে এমন একজন মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে রাজত্ব করলে কি অসাধারণ হবে ব্যাপারখানা। চোখের উজ্জ্বলতাতেই ভক্তি এসে যেতে বাধ্য। এখানে একটা মজার ব্যাপার জানলাম। ফারাও রামেসেস এর হাত দুটি যেন একটু খোলা অবস্থায় রয়েছে, বুকের উপর লাগানো নেই। শোনা গেল যে, ফরাসী প্রত্নত্বত্তবিদের দল যখন এই মমি আবিষ্কার করেন ও সংরক্ষণের কাজ করছিলেন, তখন হঠাৎ রাজার হাত দুটি খুলে গিয়ে সোজা হয়ে যাবার চেষ্টা করে। প্রথমে সবাই খুব পেয়ে যান, তবে পরে বোঝা যায় যে, হয়ত রাজার দেহকে মমি প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরী হয়, তাতে মৃত শরীর শক্ত (Rigor Mortis) হয়ে যেতে থাকে।প্রত্যেকটি মমি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে সংরক্ষিত। প্রায় প্রত্যেকটি মমির চুল, দাঁত, হাত-পা, নখ এতটাই স্পষ্ট আর পরিষ্কার যে মনেই হয়না তারা হাজার হাজার বছর আগে মৃত। এই রাজা, রানীদের দেখে বার বার একটা কথা খুব মনে হচ্ছিল যে, আমাদের দেশের ইতিহাসেও তো কত রাজা রানীর কথা পড়েছি শুনেছি। কিন্তু নিজের চোখে তাদের দেখার সুযোগ তো হয়নি বা ঘটার ও কথা নয়। তবে এই ঘরে শুয়ে থাকা রাজারা প্রত্যেকে ৪০০০ হাজার বছর আগে দাপটের সাথে রাজত্ব করেছেন, অথচ নিজের চোখের সামনে তাদের দেখতে পাচ্ছি। এই অনুভূতিটা খুব অন্য ধরনের। এই ঘরে এসে আবার যেন সময়ের হিসেব টা গুলিয়ে গেল। বার বার মনে হতে লাগল যে আমি বোধহয় টাইম মেসিনে চেপে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি।এছাড়াও সারা মিউসিয়াম জুড়ে অসংখ্য সারকফাগাস, অসংখ্য মূর্তি দেখতে পেলাম। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রানী হাতসেপ্সুতের স্ফিংক্স মূর্তি। রাজা খুফুর একমাত্র ছোট্ট একটি মূর্তি। আর সেই রাজার মূর্তি যিনি পুরনো সাম্রাজ্যের পর উত্তর ও দক্ষিণ মিশর কে আবার এক সাথে যুক্ত করেছেন।আর আছে অসংখ্য আঁকা ছবি। তার মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আমার প্রিয় একটি আপনাদের দেখার জন্য দিচ্ছি।এত সুন্দর রঙ এর ব্যবহার এত বছর আগে হতে পারে, এ যেন ধারনার বাইরেএই ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা আরও অনেক ঘরে গেলাম। সেখানে কোথাও পশু পাখির মমি করে রাখা আছে, কোথাও আছে হরেক রকম গয়না। আর অনেক মমির মুখোস দেখলাম। সেগুলি অনেক গুলি ই সোনার তৈরি। গয়নার নকসা দেখলে সত্যি ভাবতে ইচ্ছে করে যে মিশরীয়রা অপূর্ব গুণের অধিকারী ছিলেন।কায়রো মিউসিয়াম থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম ঝুলন্ত চার্চ দেখতে। মিশরীয়দের পর খ্রিষ্টানরা মিশরের দখল নেয়, আর তারও পরে মুসলিম রা। বাইবেলের গল্প অনুযায়ী, ছোট্ট যীশুকে বাঁচানোর জন্য মা মেরী পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সেই সময় কায়রোতে একটি ছোট্ট গুহাতে বেশ কিছু দিন ছিলেন। সেই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে এই চার্চ। মিশরে, এই খ্রিষ্টানদের বলে কপটিক খ্রিষ্টান। চার্চটি অপূর্ব ।দেখে বোঝা যায় যে অনেক দিনের পুরনো চার্চ। ভিতরের সমস্ত আসবাব পত্র কাঠ ও হাতির দাঁতের। রঙিন কাঁচের কাজও খুব সুন্দর।ঝুলন্ত চার্চচার্চ থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম Citadel of Salah-i-Din দেখতে। ইসলামিক শাসনে আসার পর মিশরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আসে মুসলিম সুলতানদের হাতে। তারা সব সময় ধর্ম যুদ্ধ (crusade) বা খ্রিষ্টান দের হাত থেকে মিশর কে বাঁচাতে চেয়েছে। এর জন্যই সুলতান সালাহ দিন পাঁচিল দিয়ে পুর শহরকে ঘিরে ফেলতে চান। আর তার ফলেই তৈরি হয় নতুন শহর বা সিটাডেল। বর্তমানে এই অঞ্চলটি মিশরের সামরিক বাহিনীর হাতে তবে এই সিটাডেলের মধ্যে থাকা দুটি মসজিদ, মহম্মদ আলি মসজিদ ও আলাবাস্টার মসজিদ পর্যটকদের জন্য খুলে রাখা হয়েছে। অপূর্ব সুন্দর মসজিদ দুটি। রঙ্গিন কাঁচের কাজ, পাথরের কাজ সব মিলিয়ে অনবদ্য। Alabaster মসজিদ এর আকৃতি ঠিক যেন ইস্তাম্বুলের blue mosque এর মত।আলাবাস্টার মসজিদএই মসজিদ দুটিই পুরনো কায়রো শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। আর অনেকটা উঁচুতে। লোক মুখে শোনা যায় যে গিজার পিরামিডের গা থেকে পাথর খুলে নিয়ে এই মসজিদ তৈরি হয়েছে। তবে সত্যি টা কি সেটা বোধহয় কেউ ই জানেনা। তবে এ কথা ঠিক যে পিরামিড ও এই মসজিদ সবই এক ধরনের পাথর দিয়ে তৈরি।এই মসজিদের উপর থেকে গোটা শহরটাকে দেখা যায় আর সেটা খুব সুন্দর দেখতে লাগে। ধূসর রঙের বাড়ির সারি, দূরে কালো রঙের নীল নদ, ও আর দূরে আকাশ ভেদ করে পরপর উচ্চতা অনুযায়ী দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর এক আশ্চর্য। ভাষায় সে দৃশ্য বর্ণনা করা হয়ত আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যেন চোখের সামনে স্বপ্ন নগরী ভেসে উঠছে।এখান থেকে আমরা গেলাম khan-e-Khalil বাজারে। এই বাজারটিও প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। এই বাজারে এলেই মনে হবে কলকাতার ধর্মতলায় এসে গেছি। জিনিসপত্রের দোকান ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন খাবারের দোকান। এখানে বেশ গড়গড়া টানার প্রচলন দেখতে পাওয়া গেল। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে দোকানে বসে গড়গড়া টানা এখানকার রীতি। সন্ধ্যে হতেই ঝলমলিয়ে উঠল বাজার। কেউ গান গাইছে, কেউ ফেরী করছে জিনিস, কেউ মেহেন্দি পরাচ্ছে। সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট। নির্ভেজাল মিশরীয় স্বাদ পেতে অবশ্যই এই বাজারে আসতে হবে। চারিদিকে মিশরীয় খাবারের গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভোজন রসিকরা এখানে এসে বেশ তৃপ্ত হবেন।খান-এ-খালিল বাজারআমরা প্রথমেই বসে গেলাম turkish coffee নিয়ে। সেটা কিছুটা হলেও আমাদের filter coffee-র মতই খেতে। কি সুন্দর ছোট ছোট স্টিলের কফি পটের মধ্যে করে দিয়ে গেল। সাথে কাপ। ঢালো আর খাও। এরপর খানিক বাজার করতে যাওয়া হল। এখানে সব রকম জিনিস পাওয়া যায়। দরদাম করতে পারলে কেল্লা ফতেহ। আর এসে দেখালাম মিশরীয়রা খুব বলিউডের ভক্ত। ফলে শাহ্রুখ খান বা আমিতাভ বচ্চন বলে আপনাকে সাদর আমন্ত্রন জানাবে। দেশে ফিরে বন্ধুদের উপহার দেবার জন্য কিছু কেনার হলে এইখানেই কেনা ভাল কারণ গিজা চত্ত্বরে বা অন্য কোথাও দাম বেশি হবার সম্ভাবনা।খান-এ-খালিল বাজারে পসরাএরপর আমরা আবার রাতের জন্য মিশরীয় খাবার-ই পছন্দ করলাম। ফালাফেল বা কোশারি ওখানকার খুব নাম করা পদ। খানিক টা আমাদের বিরিয়ানির মত, তাতে এত কিছু থাকে যে আমাদের একজনের পক্ষে তা একটু বেশীই হয়ে গেছিল। আর ফালাফেল আমাদের ডালের বড়ার মত খেতে। এরসাথে না না রকম চাটনি ইত্যাদি ও ছিল। ওখানে বসে খলা আকাশের নীচে মিশরীয় গান শুনতে শুনতে আমেজ টা ভালই আসছিল। তবে কায়রোর ট্রাফিক এর কথা মনে পড়াতে বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরলাম........শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ১৯, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) দ্বিতীয় পর্ব

আমাদের মিশর সফর কায়রো থেকে শুরু হয়ে কায়রোতেই শেষ হবে। আর আজ সেই দিন যে দিন আমরা বিশ্বের প্রাচীন বিস্ময়ের সামনে দাঁড়াব। আজ আমাদের পিরামিড দেখার দিন। গাড়ি করে রওনা দিলাম চরম আগ্রহ নিয়ে।আমাদের প্রথম গন্তব্য সাক্কারা। সাক্কারা হল মিশরের প্রাচীনতম Royal Necropolis বা রাজধানী। সাক্কারা তে প্রাচীন কবরস্থানও দেখা যায়। এই অঞ্চলের সব পিরামিড বা tomb গুলির সময়কাল প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৫০১৯ বছর আগেকার। এই এত বছরের হিসেবটা চট করে আমাদের মাথায় আসেনা। আমাদের মত সাধারন মাপের মানুষ জন বুঝতেই পারেনা যে, এটা ঠিক কত বছর আগে হতে পারে, আর তখন কার সাথে আজকের পার্থক্যটাই বা কতটা সেটাও বুঝতে বেশ অসুবিধা হয়। তবে সেই সব স্থাপত্যের সামনে গিয়ে বেশি কিছু বোঝার থাকেনা। শুধু বিস্ময়ে হকবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া। তাদের অস্তিত্ব্যের সামনে নিজেকে খানিকটা হাস্যকর মনে হয়।কায়রো শহর থেকে একটু দূরে সাক্কারা। Old Kingdom বা পুরনো রাজবংশের মিশরীয় রাজারা বা Pharaoh রা বিভিন্ন ভাবে পিরামিড তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। কেউ ধাপে ধাপে করে, কেউ ৪৫ ডিগ্রী কোণ করে। কোনটি আবার শুধু মাত্র ঢিবি হয়ে রয়ে গেছে। কোনটি আবার বানানোর পর ভেঙ্গে পরেছে যাদের আজকাল বলা হয় Collapsed Pyramid। সাক্কারা চত্তরে কাছে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেই সব বিভিন্ন রকমের পিরামিড এরই নমুনা।পিরামিড কথাটি এসেছে পুরনো মিশরীয় শব্দ pey-raa-mid থেকে। যার অর্থ স্বর্গে যাবার সিঁড়ি বা ভগবান রা এর কাছে যাবার সিঁড়ি। এই রা দেবতা হলেন মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেবতা, যিনি অন্য অর্থে সূর্য দেবতা। প্রাচীন মিশরীয়রা সূর্য দেব কে পূজা করতেন, কারণ তারাও মনে করতেন যে, সর্ব শক্তির আধার, প্রাণের আধার। পৃথিবীর সব প্রান্তেই, সব প্রাচীন সভ্যতাতে সূর্য দেবতার পূজা দেখে অবাক হতে হয়। দক্ষিণ আমেরিকার মায়া সভ্যতায় Kinich Ahau, মিশরীয় দের Raa, গ্রীকদের Apollo Helious বা ভারতীয়দের সূর্যদেব। এর থেকেই বিশ্বাস জন্মে যে, পৃথিবীর সব জায়গায় মানুষের ভাবনা চিন্তা এক ধরনের বা তার প্রকৃতিগত সুত্রপাত এক জায়গা থেকেই।সাক্কারা তে যে সব tomb আমরা দেখতে গেলাম সে সব ই রাজা, রানী, পুরোহিত না উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের। মিশরীয় রা বিশ্বাস করত যে, মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন। তাই এই মানুষ জীবনে যাই হোক না কেন, পরের জীবন কে সুন্দর করে তুলতে হবে। আর সেই কাজই ছিল তাদের প্রধান কাজ। তাই জন্যই তারা এই পিরামিড বানাত। আর পিরামিড কে সব উপায়ে সুন্দর করার চেষ্টা করত। সাক্কারা তে আমরা একটি পিরামিড এ ঢুকলাম। সেটা রাজা বা ফারাও তিতির। বেশ ৫০-৬০ ফুট নীচে নামতে হল। ঘাড় নীচু করে কোমর বেঁকিয়ে নামলাম নীচে। এবার অবাক হবার পালা। পিরামিডটির সাদা দেওয়াল জুড়ে প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় লেখা যাকে বলে hieroglyph writings. লেখা না বলে আঁকা বললেই বোধহয় ঠিক হবে। সব শেষে গেলাম সেই জায়গায় যেখানে মমি রাখা হত। এই ঘর কে বলে sarcophagus room। ভাবার চেষ্টা করতে লাগলাম যে কি করে অত বছর আগে প্রাচীন মিশরের মানুষ কি করে এই সব বানিয়েছিলেন আর কি করেই বা কি করতেন তারা।হিয়েরগ্লিফ লেখা, সাক্কারা পিরামিডের ভিতরেএই সব আঁকা বা লেখা কতবার ই তো ছবির বইতে দেখেছি। কিন্তু সামনে দেখার যে অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা সে লেখার ভাষা আমার নেই। অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। মনে হল যে আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে, সদ্য মৃত কোন প্রিয় ফারাও কে চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়ে এই পিরামিডে চিরনিদ্রায় ঘুম পারিয়েছিল তার রাজ্যবাসী। যত ভেবেছি তত অবাক হয়েছি। এরপর গেলাম সেই চত্বরেই অন্য একটি পিরামিড-এ। সেখানে দেওয়াল চিত্র আরও বেশি স্পষ্ট, ভাবাই যায়না যে সেগুলি এত বছর আগেকার। এখানে দেওয়াল এর বাইরের অংশের লেখা বা আঁকা দেওয়ালে গর্ত করে করে লেখা হত। আর দেওয়ালের ভিতরের অংশ এ wedged out পদ্ধতিতে, অর্থাৎ শুধু লেখা অংশ টিকে রেখে দিয়ে বাকি অংশ চেঁচে ফেলে দেওয়া হত। এর কারন ও খুব স্পষ্ট, বাইরের দিকের দেওয়াল রোদ বৃষ্টি গরম সব সহ্য করবে তাই ক্ষয় হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি তাই গর্ত করে করে লেখা হত, আর দ্বিতীয়ত দূর থেকে এই ধরনের লেখা হলে দেখতে সুবিধা হবে। আর ভিতরের দেওয়ালে কোন অসুবিধা নেই, তাই যে ভাবে খুশি ছবি আঁকা হয়েছে আর সুন্দর করা হয়েছে।প্রাচীন মিশরীয় যে কোন ছবিতে দেখা যায় যে পুরুষ ও মহিলাদের গায়ের রঙ আলাদা। পুরুষ দের গায়ের রঙ হত গাঢ় মেরুন বা খয়েরি বা একদম কালো আর মহিলাদের গায়ের রঙ হত হালকা যেমন হলুদ বা সাদা। এর কারন হিসেবে বলা যেতে পারে যে সমাজের নিয়ম অনুসারে পুরুষ রা বাইরে কাজে যান তাই তাদের গায়ের রঙ গাঢ় হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে যে সেই অত বছর আগেও এত শক্ত সামাজিক ধারণা মিশরীয়দের ছিল। মিশরীয় সমাজে দেবীই হোক বা সাধারণ নারী সবাই গৃহ বধুর তকমা পেত। তাদের মধ্যেও এই ধরনের বিভেদ দেখে বেশ অবাক হতে হয়। আর এতেই ধারণা আরও স্থির হল যে মানুষের ভাবনা চিন্তা সব সময়ই স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে একই ধরনের হয়ে থাকে।স্টেপ পিরামিদ, সাক্কারাএখান থেকে আমরা গেলাম সেই বিখ্যাত স্টেপ পিরামিড দেখতে। archeological কাজ চলার জন্য একদম কাছে যাওয়া হল না আর ভিতরে ঢোকা গেলনা। মিশরের প্রধান স্থপতি ইমহতেপ (Imhotep) এই পিরামিডটি সবার প্রথমে বানান। এই পিরামিড টি তখন কার ফারাও Djoser এর জন্য গঠন করা হয়।এই পিরামিডটির প্রায় ৬ টি ধাপ আছে, যা মাটি থেকে ক্রমশ ছোট হতে হতে উপর দিকে উঠেছে। এই পিরামিড টিও হলুদ রঙ এর বেলে পাথর বা sand stone দিয়ে তৈরি। হলুদ রঙের, বিশাল এক স্থাপত্য ৪০০০ বছর ধরে ক্রমশ ধীরে ধীরে স্বর্গের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে মিশরীয় সভ্যতাকে সেই স্বর্গের উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।Papyrus এ আঁকা রাজা অসিরিসের শেষ বিচার সভাএই পিরামিড চত্বরেই আমরা দেখলাম ফারাও Djoser এর mortuary temple। এই temple বা মন্দির মানুষের মৃত্যুর পর মমি তৈরি করার জায়গা। মিশরীয়দের নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর পর ৭০ দিন ধরে মমি তৈরির কাজ চলে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর দেবতা Anubis বা শেয়াল দেবতা এই পদ্ধতি শুরু করেন। প্রথা অনুসারে মৃতের দেহ থেকে প্রথমে যকৃৎ (liver) , শ্বাসযন্ত্র বা ফুস্ফুস (lungs) , পাকস্থলী (stomach) , ও অন্ত্র (intestine) বের করে নেওয়া হত। এই অঙ্গ গুলিকে এক একটি কৌটো এর মধ্যে ভরে রাখা হত কিছু রাসায়নিক তরলের মধ্যে, যার রহস্য আজও অজানা। আর এই কৌটো গুলি বিভিন্ন জন্তুর মুখের ছবি দেওয়া হত। এই ধরণের কৌটো গুলি কে বলা হয় canopic jars। মস্তিষ্ক বের করে আনা হত নাসারন্ধ্র দিয়ে। মস্তিষ্ককে সংরক্ষণ করা হত না। হৃদয় রেখে দেওয়া হত শরীরের মধ্যে। মিশরীয় রা বিশ্বাস করত যে মানুষের দেহে হৃদয়ই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই হৃদয় বা মিশরীয় ভাষায় Ba এর বিচার, মানুষের জীবনের শেষ দিনে, ভগবান Osiris এর দরবারে হবে। সেই খানেই স্থির হবে যে এই মানুষটি স্বর্গে যাবার উপযোগী কিনা। যদি উপযোগী হয়, তাহলে Ba রূপ বদলে হয়ে যাবে কা (Ka),যা অবিনশ্বর।Papyrus এ আঁকা আনুবিস শেষ বিচার করছেন ছবি ইন্টারনেটFinal judgement বা শেষ বিচার হয় দেবতাদের রাজা বা মিশরীয়দের প্রধান দেবতা অসিরিস বা Osiris এর দরবারে। সেখানে ১২ জন দেবী (যারা দিনের ১২ ঘণ্টার প্রতিনিধি) মানুষের আত্মাকে প্রশ্ন করেন ১২ টি প্রশ্ন। এর মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে স্বর্গে যাবার সুযোগ ঘটে। যেমন উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাজা অসিরিস, চেয়ারে বসে বিচার করছেন। আনুবিস দাঁড়িপাল্লাতে বা কে ওজন করে দেখছেন। অন্যান্য দেবতারা সেই বিচারের ফলাফল আবার অসিরিস কে জানাচ্ছেন। কি চমৎকার দর্শন, কি সুন্দর সহজ চিন্তাধারা ।আর এই ছবিতেও আনুবিস কে সেই বিচার কাজে সাহাজ্য করতে দেখা যাচ্ছে। এই স্টেপ পিরামিড চত্বর থেকেই দূরে মরুভুমির মধ্যে দেখা গেল bent pyramid, red pyramid আর আরও দূরে Great Pyramid বা Giza.Step Pyramid ঘুরে আমরা গেলাম প্যাপিরাস কারখানাতে। সেখানে প্যাপিরাস তৈরি করা দেখলাম। পদ্ধতি টা বেশ সুন্দর ও সহজ। প্যাপিরাস আসলে এক ধরনের ঘাস জাতীয় গুল্ম। সেই গাছের নরম ডাল কেটে জলে ভিজিয়ে রাখলে, পাট গাছের মতই তার পাতলা আস্তরণ বেরিয়ে আসে। এবার সেই আস্তরণ গুলিকে লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি, তাঁত বোনার মত করে রেখে কোন ভারি বস্তু দিয়ে চেপে রাখতে হয় অনেক্ষন। এই ভাবে চাপে রাখার ফলে তৈরি হয় প্যাপিরাস বা paper। এই পাপিরাস থেকেই পেপার শব্দটি এসেছে, পেপার ও বর্তমানে তৈরি হয় খানিকটা এই পদ্ধতি ধরেই। আশ্চর্যের বিষয় অত বছর আগে মিশরীয়রা কি করে এই প্রথা আবিষ্কার করেন। এই কারখানায় আদর আপ্পায়নের ব্যাপার ই আলাদা। সেখানে যেতেই আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হল আমরা hibiscus tea খাব কিনা? আর খেলে কেমন খাব? ঠাণ্ডা না গরম। জবার চা হয় জানতাম না, গরম ও ছিল ভাবলাম ঠাণ্ডাই খাই। যেমনি বলা ওমনি এসে গেল ছোট গ্লাসে করে লাল রঙ এর পানীয়। বেশ ঠাণ্ডা । জবার চা মানে লাল ত হবেই, তবে চা সুলভ কোন গন্ধ নেই। চেখে দেখলাম, বেশ টক মিষ্টি খেতে আর গরমের মধ্যে মনে হল অমৃত। সেই চা খেয়ে এতটাই আপ্লূত হলাম যে দেশে ফিরে Amazon থেকে খুঁজে order দিয়ে দিলাম। এখনও সে চা বাড়িতে আছে আর গরম কালে খেতে ভালই লাগে।Papyrus গাছদুপুরে খাবার পর আমরা Giza যাবার রাস্তা ধরলাম। তখনও নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। বেশ কিছুটা traffic jam কাটিয়ে পৌঁছলাম Giza চত্বরে । রাস্তায় একটা বাঁক নিয়ে গাড়ি যখন ঘুরলো, দেখতে পেলাম রাজা খুফুর পিরামিডকে। পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতমকে। দূর থেকে দেখেই তার বিশালত্বে কেমন যেন ঘাবড়ে গেছিলাম। তারপর মনে হল স্বপ্ন দেখছি । নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে সত্যি ই আমি Great Pyramid এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এতদিন এর স্বপ্ন দেখার চূড়ান্ত পরিনতি আমার সামনে। পৃথিবীর প্রাচীনতম ইতিহাস এর সাক্ষীর সামনে আমি।Giza হল রাজা বা ফারাও খুফুর সমাধি বা পিরামিড। এই ফারাও আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে মিশরে রাজত্ব করেন। তাঁর সময়কাল প্রায় ৫০ বছরের। মিশরের ইতিহাস এ এই সময়টিকে পুরানো রাজত্বকাল বা old kingdom বলে। ফারাও খুফু Cheops নামেই পরিচিত ছিলেন। শোনা যায় এই নাম তাকে গ্রীক ঐতিহাসিকরা দিয়েছিলেন।Great Pyramid, ফারাও খুফুর পিরামিডখুফুর ;পিরামিড প্রায় ৪৮১ ফুট উঁচু, আর এটি যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার দৈর্ঘ্য ৭৫৬ ফুট। মোটামুটি ভাবে ২৫৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এটি বানানো শেষ হয়। এই পিরামিড এর গায়ে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন পাথর আছে , যার এক একটির ওজন ৩ টন । এই পিরামিড এর হলুদ পাথরের উপর আগে চুনা পাথরের প্রলেপ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটি আর নেই। সাদা চুনা পাথরের প্রলেপ এর জন্যই এই পিরামিড এর আসল রঙ ছিল ধবধবে সাদা। সাহারা মরুভুমির মধ্যে এই বিশাল আকৃতির সৌধটি যখন রোদের আলোয় ঝলমল করত , তখন তাকে ঠিক এক টুকরো হীরে বলেই মনে হত। এর মাথার উপরে আরও ১৪ ফুট উঁচু একটি অংশ ছিল। আজ যা আর দেখতে পাওয়া যায়না । সেই উচ্চতা যোগ করলে আজও এই পিরামিডটি পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সৌধ, যা মানুষের হাতে তৈরি। তবে তা সত্ত্বেও এর বিশালতা ও গঠন আজও মানুষকে অবাক করে।একসাথে তিনটি পিরামিড, গিজাফারাও খুফুর পিরামিড এর পাশেই আছে ফারাও খাফ্রেন (Khafrain) এর পিরামিড। এই রাজাও old Kingdom এর সময়ই রাজত্ব করেছিলেন। এই পিরামিডটির একদম উপরের অংশে সাদা চুনা পাথরের প্রলেপ কিছুটা হলেও আছে। এটি গিজার থেকে উচ্চতায় একটু ছোট। তবে গিজা পিরামিডের উপরের ১৪ ফুট অংশ না থাকায় এটিকে অনেক সময়ই বেশি উঁচু বলে মনে হয়। তবে যে পরিমান ভুমির উপর পিরামিড দুটি বানান হয়েছে সেটি লক্ষ্য করলেই সেই ভুল ভাঙে।ফারাও মানকুরের পিরামিড, গিজাএই পিরামিডটির পিছনে আছে আরও একটি ছোট মাপের পিরামিড। এই ছোটটি ফারাও মানকুরের (Mankure)। যে কোন পিরামিডের ভিতরেই ঢোকা যায়, তবে তার জন্য আলাদা টিকিট এর ব্যবস্থা আছে। খুফুর পিরামিড সারা বছর পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে আর বাকি দুটি ৬ মাস করে এক একটি। তবে এই পিরামিড গুলির ভিতরে কিছুই নেই। না আছে কোন ছবি, লেখা, না কোন জিনিস পত্র। সব ই সেগুলি জাদুঘর এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা মানকুরে পিরামিডের জন্য আলাদা টিকিট কেটে তার ভিতরে গেলাম। এখানেও প্রায় ৫০ ফুট নীচে নামতে হল। তবে আগের বারের অভ্যেস থাকায় খুব অসুবিধা হয়নি। ভিতরে গিয়ে প্রধান ঘরটিতে দাঁড়ালাম, সামনে একটি পাথরের বাঁধানো জায়গা, যেখানে শোয়ানো ছিল ফারাও মানকুরের সারকোফাগাস।মিশরে পিরামিড তৈরি হবার সময় থেকেই পিরামিডের ধন সম্পত্তি লুঠ করার প্রবনতা দেখা যায়। ফারাও রা অনেক চেষ্টা করেও সেই সব চোরদের আটকাতে পারেননি। মিশরের মানুষ জানত যে পিরামিদের মধ্যেই লুকানো আছে ফারাওদের সব ধন সম্পত্তি। তাই পরজন্মে বিশ্বাস থাকলেও চুরি করতে তাদের বাঁধেনি। তারাই পিরামিডগুলিকে নষ্ট করেছে বেশি। পরের দিকে ফারাওরা বুঝতে পেরে, পিরামিড বানান বন্ধ করে অন্য রকম ভাবে তাদের সৌধ বানাতে থাকেন। তবে তাতেও যে কত টা চুরি আটকানো গেছে, সেটা সবার অজানা।এখান থেকে আমরা গেলাম solar boat museum বা সৌর নৌকা দেখতে। এই সৌর নৌকা কিসে কাজে লাগে সে বিষয়ে পরে আসছি। সৌধ গুলির পাশে নৌকা থাকার কয়েকটি কারণ আছে। মিশরীয়দের মতে মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবার রাস্তা দুটি, পায়ে হেঁটে বা নৌকা চড়ে। তাই প্রতি পিরামিড এর পাশে একটি করে নৌকা রাখার জায়গা ও কিছু নৌকার ধ্বংসাবশেষও পাওয়া গেছে। সেগুলির মধ্যে অবশ্যই ফারাও খুফুর টি সব থেকে বড়। নীচের ছবিটিতে সেই সৌর নৌকা রাখার গর্ত খানি দেখা যাচ্ছে।সৌর নৌকা রাখার গর্তএই নৌকাটি বর্তমানে পাশেই তৈরি একটি মিউজিয়ামে আছে। এই নৌকাটি এতটাই বড় যে এর ছবি তোলা প্রায় অসম্ভব। আর এই museum এ ছবি তুলতেও দেয়না। তাই মনের ক্যামেরাতেই সেই ছবি ধরে রাখতে হল। নীচের ছবি টি ইন্টারনেট এর সৌজন্যে। তবে সেখানেও পুরো নৌকা টি বোঝা যাচ্ছেনা।নৌকা থাকার আরও একটি কারণ আছে। মিশরীয় পুরাণ অনুযায়ী, তাদের প্রধান দেবতা অসিরিস যিনি অধোলোক এর দেবতা, ভবিষ্যৎ জীবনের দেবতা ও ফলশালিত্বের দেবতা। তাঁর মৃত্যু হয় তাঁর ভাই সেথ এর হাতে। সেথ হলেন মিশরীয়দের মন্দ দেবতা। সেথ অসিরিসকে হত্যা করবার পর তাঁর দেহকে ১৮ টি টুকরো করে মিশরের সব প্রান্তে ছড়িয়ে দেন। তার থেকে জন্ম নেয় মিশরের ১৮ টি রাজ্য। অসিরিস এর স্ত্রী দেবী ইসিস, যিনি জাদুর দেবী, তিনি তখন সেই ১৮ দেহাংশ খুঁজে নিয়ে, জোড়া দিয়ে আবার অসিরিস এর দেহ সম্পূর্ণ করেন। অবশেষে ফারাও অসিরিসের মৃতদেহ নিয়ে মমি প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেবী ইসিস (Isis) যিনি জাদু,সৌন্দর্য, ও প্রেমের দেবী, স্বামী অসিরিস এর মমি তৈরি হয়ে গেলে সৌর নৌকা করে স্বর্গে যাত্রার অনুমতি দেন। নৌকার একদিকে দেবী ইসিস ও অন্যদিকে দেবী নেপথিস (যিনি অসিরিস এর দ্বিতীয় স্ত্রী ও সৎ বোন) বসেন, দেবীরা অসিরিস কে এই ভাবেই পরবর্তী জীবনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই ভাবেই এটি একটি নিয়ম হয়ে যায় যে, মৃত্যুর পর মমি হওয়া দেহ নৌকা করে পিরামিডে যাবে। এই যাত্রায় ফারাও এর সঙ্গে থাকবেন তাঁর একান্ত আপন পরিবার বর্গ। বিশেষ করে দু জন মহিলা আত্মীয়াকে থাকতেই হবে। আর এই ছবিও খুবই পবিত্র মনে করা হত। এই গল্প শুনে কেমন আমাদের পুরাণের সতী দেবী ও মহাদেব এর গল্প মনে পরে যায়। সেখানেও সতী দেবীর দেহাবশেষ দিয়ে তৈরি ৫১ টি ধর্মীয় স্থান। ভারতীয় জীবনেও এই স্থানের গুরুত্ব যথেষ্ট।নৌকাটি এতটাই বড় যে এর ছবি তোলা প্রায় অসম্ভবফারাও খুফুর সেই সৌর নৌকা মাটির তলায় প্রায় ৩০ ফুট নীচে বড় বড় পাথরের চাঁই দিয়ে ঢাকা ছিল। এই নৌকার দৈর্ঘ্য ১৪৩ ফুট ও প্রস্থ ১৯.৫ ফুট।এটিকে পৃথিবীর সবথেকে পুরনো জাহাজ আখ্যা দিয়েছেন ঐতিহাসিকরা। এই নৌকাটি অনেকগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এই জাহাজ এ একটিও পেরেক নেই। নৌকা টির ১২২৪ টি ছোট ছোট টুকরো খুলে নিয়ে, ১৯৫৪ সালে জাহাজটিকে আবার নতুন করে বানানো হয়। বিশাল একটি মিউসিয়াম করে এখন সেটিকে সংরক্ষন করা হয়েছে।সৌর নৌকার মডেল, কায়রো মিউজিয়ামসৌর নৌকা দেখে আমরা গেলাম সেই স্ফিংক্স দেখতে। বিকেল হয়ে গেছিল বলে পুরপুরি সামনে থেকে দেখতে পাওয়া গেলনা। সত্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যে সময় হয়ত থেমে গেছে। এক দৌড়ে আমি যেন পৌঁছে গেছি বহু হাজার বছর পিছনে। আরও মনে হচ্ছিল যে কত তুচ্ছ আমাদের এই একটা জীবন। এই স্ফিংক্স পিরামিডকে পাহারা দেয় বছরের পর বছর আর বর্তমান যুগের মানুষদের জানান দেয়, World fears time, and time fears pyramid।ফারাও অসিরিস ও তাঁর দুই রানী, দেবী ইসিস ও দেবী নেপথিস, কায়রো মিউজিয়ামস্ফিংক্সের মূর্তিতে সবসময়ই মুখটি হয় মানুষের আর দেহ হয় সিংহ এর। এর পিছনেও মিশরীয় দের কারণ আছে। মানুষ এর বুদ্ধি ও সিংহ এর শক্তি নিয়ে যদি সত্যি কোন প্রানী তৈরি করা যায় তাহলে সেই প্রানীই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর এমন শক্তিশালী প্রানীরাই পারে পৃথিবীতে রাজত্ব করতে। মিশরীয় সভ্যতায়, সব ফারাও ও রানীদের স্ফিংক্স মূর্তি তৈরি হত। প্রজা বা সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। এই Great Sphinx হল ফারাও খাফ্রেন এর।পড়ন্ত বেলায় গ্রেট স্ফিংক্সস্ফিংক্স দেখে আমাদের সকালের সফর শেষ হল। সন্ধ্যের সময় আবার স্ফিংক্স এর সামনে এলাম light and sound প্রদর্শন দেখতে। অসম্ভব সুন্দর সেই প্রদর্শনী দেখতে দেখতে যেন আমরাও ইতিহাসকে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত দেখতে পেতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল আমরাও যেন সেই সময় এরই সাক্ষী। স্ফিংক্স যেন সত্যই, কথা বলছে। আমিও যেন দেখতে পাচ্ছিলাম সম্রাট নেপলিয়ান বা আলেকজান্ডার এসে স্ফিংক্সের সামনে নতজানু। ইতিহাস এর শুরুই তো এখান থেকে। আর সেই ইতিহাস সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে আজকের দিন পর্যন্ত স্ফিংক্স সব দেখেছে নিজের চোখে। সে যদি সত্যি কথা বলতে পারত তাহলে বলত গল্প, ছোটবেলার গল্প দাদুদের মত, তাহলে কত গল্পই না বলত সে। নির্বাক শ্রোতা হয়ে শুধু দেখে চলেছে সে। ভুত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সবই যেন তার হাতের মুঠোতে। সব পরিবর্তনকে সহ্য করে সাহারা মরুভুমির বুকে দাঁড়িয়ে আছে স্ফিংক্স। আর থাকবেও আরও অনেক অনেক বছর, যখন আমরা কেউ থাকবনা। সেই দিনও সে একই ভাবে সবাইকে ইতিহাস শোনাবে স্ফিংক্স।গ্রেট স্ফিংক্সআজকের দিনের যাত্রা এখানেই শেষ করে হোটেল মুখি হলাম, সঙ্গে রইল স্ফিংক্স এর বলা গল্প আর রাতের আলোয় দেখা পিরামিড এর স্মৃতি।শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ১৩, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) প্রথম পর্ব

শুরুর কথাইতিহাসের ছাত্রী হয়েছি অনেক বড় বয়সে। ছোটবেলায় ইতিহাস নিয়ে পড়ার কথা খুব একটা ভাবিও নি। তবে যেটা ছোট বেলা থেকেই আকর্ষণ করত, তা হল গল্প। গল্প শুনতে বা পড়তে তখন ও ভালো লাগত আজও লাগে। বিভিন্ন দেশের গল্প, বিভিন্ন সময়ের গল্প। বাবা অনেক দেশের বই কিনে দিতেন আর মা পড়ে শোনাতেন। একটু বড় হতে নিজেই পড়তে থাকতাম সে সব। পুরাণ, রুপকথা, ইতিহাস ছোটোদের মতন করে লেখা বই সব। আর সেই রকম ই একটা বই আমার ছিল, Wonders of the World। এই বইটার হাত ধরেই প্রথম পরিচয় হল পিরামিড এর সাথে। এতটাই আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম যে বলার নয়। পিরামিড, হিয়েরগ্লিফ, ফারাও তুত, সব মিলিয়ে কেমন ঘোর লেগে গেল। তখনও বুঝিনি যে এই ঘোর অনেক দিন ধরে তাড়া করে বেড়াবে আমায়।বড় হতে লাগলাম এই স্বপ্ন নিয়ে যে একদিন যাব, দেখব, বুঝব মিশরকে। বাবার কাছে মিশর সংক্রান্ত অনেক বই ছিল। খালি ঘাঁটতাম। একদিন আনন্দমেলা বা কোন একটা মাসিক পত্রিকা থেকে জেনে ফেললাম কার্টার ও কারনারভান এর আভিশাপ এর গল্প। সত্যজিৎ নিয়ে গেলেন শেয়াল দেবতার কাছে। জেনে ফেললাম আনুবিস কি ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। মিশর রহস্য তে সুনীল গাঙ্গুলী প্রথম ভাল ভাবে সেখালেন হিয়েরগ্লিফ কাকে বলে আর কি ভাবেই বা সেতা লেখা বা পড়া হয়। কাকাবাবুর আর সন্তু কে যেন স্বপ্নে দেখতে পেতাম আর ভাবতাম অদের সাথে আমিও চলেছি রহস্যের সমাধানে। ইংরেজি ছবির হাত ধরে The Mummy দেখে জানার চেষ্টা করলাম মিশরীয় ভাবনা চিন্তা। এ সব ই যেন আমায় মিশরের সাথে আর বেশী করে জুড়ে দিচ্ছিল। আর চোখের সামনে মিশর দেখার স্বপ্ন টাকে তৈরি করতে সাহায্য করছিল।ইতিহাস নিয়ে যখন পড়তে শুরু করলাম, পৃথিবীর ইতিহাস syllabus এ ছিলনা। তবুও বোঝার চেষ্টা করতাম যে আমাদের সাথে অদের কি মিল, কথায় মিল। আমাদের দেশের পুরাণ বা কিংবদন্তির সাথে ওদের এত সাযুজ্য কেন। যেমন Geranldine Pinch বলেছেন many definitions have been proposed সেই থেকেই ধরে নিতে থাকি যে ওরা আর আমরা মানুষ বলেই এত সাযুজ্য। তবে পরে ভুল ভাঙে আর বুঝতে পারি যে ওরা, মিশরীয় রা আমাদের থেকেও অনেকটাই উন্নত মানের মানুষ ছিলেন।পড়া শেষে, ইতিহাস এর শিক্ষিকা হয়ে স্কুলে যোগ দিলাম। বার্ষিক প্রদর্শনী হিসেবে মিশরকে বেছে নিলাম আর অদম্য উৎসাহে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নেমে পরলাম গবেষণার কাজে। Internet এর যুগে মিশর যেন নিজেকে উজার করে দিতে লাগল আমাদের কাছে। আর বহু দিনের সেই ছুঁতে চাওয়ার ইচ্ছে টাকে বার বার উশকে দিতে লাগল। এর সঙ্গে যোগ হল বাবার উৎসাহ। বিভিন্ন পর্যটন মেলা ঘুরে মিশরে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে তথ্য যোগার করে বেড়াতো। আর তাঁর সাথে যুক্ত হল আমার বর। তারও বহুদিনের সখ আর স্বপ্ন যেন মিশে গেল। তারপর আর কি, যেমন ভাবা তেমন কাজ। জীবনসঙ্গীকে আর বাড়ির সবাইকে সঙ্গে করে ২০১৮ এর পূজার ছুটি তে পাড়ি দিলাম মিশর। সঙ্গে অনেক না দেখা স্বপ্ন, কিছু বই , ক্যামেরা আর লেখার খাতা কে নিয়ে। নীলনদের পাড়ে , ফারাও এর দেশে।যা কিছু দেখে এলাম তা ভোলার নয়। তবুও যেন একটা না পাওয়া থেকেই গেল, খালি মনে হতে লাগল যে সব শেষ হল না। তাও যা দেখলাম তাও মন্দ কি।**ফারাও এর দেশ ঘুরে**স্থানীয় সময় দুপুর ১২ টায় আমরা কায়রোর মাটিতে নামলাম। শুরু হল স্বাপ্নের দেশে যাত্রা। ইতিহাস এর ছাত্রী হিসেবে মিশর সব সময়ই প্রিয় বিষয় ছিল। আর স্বপ্ন ও দেখতাম কোন এক দিন ঠিক যাবো সেই দেশ এ। তবে সত্যি সেটা সম্ভব হবে ভাবিনি কোনদিন। নিজের চোখ কে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে মিশর আমার সামনে। কায়রোর সুন্দর বিমান বন্দর ছাড়িয়ে যখন বেরলাম মনের মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। গাড়ি তে করে রওনা হলাম নিজেদের হোটেলের দিকে। আর অন্য দিকে যেন স্বপ্ন আস্তে আস্তে তার রঙ দেখাতে লাগল। মিশর আসার আগেই ঠিক করে ছিলাম মনে মনে যে, এই কদিন এ যা দেখব সব ক্যামেরা বন্দি করা যাবেনা। তাই চোখের দায়িত্ব বাড়বে অনেকটাই। দেখতে লাগলাম প্রাণ ভরে কায়রো শহর। ধূসর রঙের শহর কায়রো। মরুভুমির কাছে বলে বাতাসে আর্দ্রতা বেশ কম আর তার ফলে নীল আকাশ ঝক ঝক করছে। নীল আকাশের সাথে ধূসর রঙের ঘর বাড়ি এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য তৈরি করেছে।কায়রো কে এক ঝলক দেখলে মনে হবে নিজের দেশেই আছি। মরুভূমির দেশ বলে এখানে বাড়ির রঙ ধূসর বা হাল্কা। চড়া রঙের ব্যাবহার এরা জানেনা। আসলে এদের দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাস এতটাই বর্ণময় যে অন্য কোথাও রঙ ব্যাবহারের প্রয়োজন হয়না। তবে একটা ব্যাপার বোঝা গেল সহজে, যে এই দেশেরও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আসতে সময় লাগবে । সামাজিক উন্নয়ন ও অনেকটাই পিছিয়ে বলে মনে হল। রাস্তায় ভাল রকম ট্রাফিক জ্যাম পেতে হল তবে অবশেষে আমরা আমাদের হোটেলে এসে উপস্থিত হলাম। দীর্ঘ যাত্রা ও অপেক্ষার অবসান হল।রাস্তায় আসার পথে একটা ব্যাপার দেখে খুব মজা লাগল যে, প্রতিটি বাড়ির ছাদ আবর্জনায় ভর্তি। বাড়ির যত বাতিল জিনিষ পত্র দিয়ে ছাদ বোঝাই। এর কারণ ঠিক বোঝা গেলনা তবে পরে বুঝেছিলাম যে এটা সমগ্র মিশরের ই চরিত্র। যে কোন শহরেই এই এক ব্যাপার। আর কায়রো রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও একটা অদ্ভুত গ্রাম্য চরিত্র আছে, হয়ত সেটা শিকড়ের টানের চটেই।বিমানে আসার কোন ক্লান্তিই যেন আমাদের দমাতে পারছিল না। শুধু মাত্র দুপুরটুকু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধেবেলার আয়োজন নিয়ে মেতে উঠলাম। সন্ধ্যের কায়রোর মধ্যে দিয়ে আমরা চললাম Nile Cruise এ রাতের খাবার খেতে। মানে নীল নদের উপর নৌকা বিহার ও তার সাথে খানা পিনা। নীল নদের সামনে দাঁড়িয়ে মনে পরে যেতে লাগল স্কুলের ভূগোল বই এর প্রশ্ন মিশর কে কোন নদীর দান বলা হয়? বা পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীর নাম লেখ। সেই প্রশের উত্তরে ভুল কখনও করিনি তবে এটাও ভাবিনি যে একদিন সেই নদীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। চওড়া নদী, রাতের অন্ধকারেও তার গভীরতা সম্মন্ধে যথেষ্ট ধারণা করা যায়। শহরের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও নংরা আবর্জনা নদীর ধারে নেই। নদীর দুই পাশ সুন্দর করে বাঁধিয়ে দেওয়া আছে। শহরের বিভিন্ন আলো নীল নদ কে ছুঁয়ে যেন নিজেদের ধন্য করে নেবার চেষ্টা করছে। এত বিশাল সেই নদীর সামনে দাঁড়িয়ে আমার কেমন যেন মনে হল যে, এই যে সব কিছু হচ্ছে তাতে নীল এর কিছু এসে যায়না। সে যেন আপন তালে আপন ছন্দে ও গতি তে বয়ে চলেছে, বয়ে চলাটাই তার এক মাত্র কাজ, যা সে জীবনের শুরু থেকে করে আসছে। এত কিছু ঘটেছে তার চোখের সামনে, সব কিছুর সাক্ষী সে। তাই এই সব মানুষ জন দের বেশি উৎসাহ নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই।আমরা Nile Pharaoh নামের একটি নৌকা বা cruise এ উঠলাম। নৌকার সামনেটা খুব সুন্দর করে সাজানো। পুরো নৌকা টাই ট্র্যাডিশনাল মিশরীয় ধাঁচে সাজানো। মিশরীয় solar boat এর আদলে। নৌকায় প্রবেশের মুখ পাহারা দিচ্ছে রাজার প্রহরীরা। নৌকার ভিতরে অনেক টেবিল সাজানো আর তার এক পাশে একটি মঞ্চ, সেখানে নাকি নাচ গান হবে। নৌকার ছাদেও যাওয়া যায় সেখানেও টেবিল পাতা আছে।Nile Pharoa, বোট, কায়রোছাদে গিয়ে বেশ শীত শীত করছিল। নীল নদের উপর দিয়ে বয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ার চোটে। নৌকা চলতে শুরু করল রাত ৮ টায়। আর তার সাথে শুরু হল সেই খালি মঞ্চে বেলি ড্যান্স belly dance আর সুফি গানের অনুষ্ঠান। বিভিন্ন রকম খাবারের মধ্যে দিয়ে শুরু হল রাতের খাওয়া। খাওয়া শেষ করে গেলাম নৌকার ছাদে। নীল নদের কালো জল ঠেলে এগিয়ে চলেছে নৌকা। গোটা শহরটাকে দেখা যাচ্ছে নদী থেকে। জলের আসা যাওয়া দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যে, এই সেই নীল নদ। যাকে নিয়ে পৃথিবী জুড়ে গল্প বা রোমাঞ্চের শেষ নেই। যার তৈরি প্লাবন ভূমিতে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন তার উপর দিয়ে বয়ে চলা নৌকাতে চলেছি আমি। আর আজও, এত আধুনিক যুগেও মিশরের জন্য এই নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাত প্রায় ১০.৩০ নাগাদ আমাদের নৌকা ভ্রমণ শেষ হল আর ক্লান্ত শরীরে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। রাতে ভাল ঘুম আমাদের সবার অত্যন্ত প্রয়োজন কারণ পরের দিনের জন্য নিজেদের তৈরি করতে হবে।শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ০৫, ২০২২

ট্রেন্ডিং

দেশ

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার একেবারে কাছে ভারতের নতুন বিমানঘাঁটি, এবার কী বড় পদক্ষেপ করতে চলেছে সেনা?

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। গত বছর চালু হয়েছে লাদাখের নোওমা বিমানঘাঁটি। সীমান্তে যে কোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা মাথায় রেখেই বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে এই বিমানঘাঁটি। সেনা সূত্রে খবর, কৌশলগত দিক থেকে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানঘাঁটি।২০২১ সালে এই প্রকল্পে অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। বিমানঘাঁটি তৈরির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ২১৪ কোটি টাকা। অনুমোদন পাওয়ার পরেই শুরু হয় নির্মাণের কাজ। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর অবশেষে গত বছর চালু হয় এই বিমানঘাঁটি।লাদাখের নোওমা অঞ্চল প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার খুব কাছেই অবস্থিত। সেই কারণে এই বিমানঘাঁটির গুরুত্ব অনেকটাই বেশি। সীমান্তে কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সেখানে পৌঁছতে পারবেন বায়ুসেনার কর্মীরা। পাশাপাশি উত্তর সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলিতেও সহজে পৌঁছনো সম্ভব হবে।লাদাখের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থলপথে যাতায়াত বেশ কঠিন। বিশেষ করে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম পাহাড়ি রাস্তার কারণে অনেক সময় সেনার কাছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে সমস্যা হয়। নোওমা বিমানঘাঁটি চালু হওয়ায় সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ভারতের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা এবং সেনার দ্রুত যাতায়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে এই বিমানঘাঁটি।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
রাজ্য

‘খুব তাড়াতাড়ি জেলে যাবেন অভিষেক’, কালীঘাটের অশান্তির পর বিস্ফোরক দাবি বিজেপি নেতার!

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর। তাঁর দাবি, খুব তাড়াতাড়ি জেলে যেতে হতে পারে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে। শনিবার কল্যাণীতে সাংসদ কার্যালয়ের উদ্বোধন করতে এসে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই মন্তব্য করেন তিনি। কালীঘাটে অভিষেকের বাড়ির সামনে রাতভর উত্তেজনা এবং পুলিশের সঙ্গে তাঁর বচসার প্রসঙ্গ উঠতেই এই দাবি করেন শান্তনু।বনগাঁ লোকসভার অন্তর্গত কল্যাণী বিধানসভা। ২০১৯ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন বিজেপি প্রার্থী শান্তনু ঠাকুর। এত দিন কল্যাণী-সহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সাংসদের সঙ্গে দেখা করতে বা বিভিন্ন কাজের জন্য বনগাঁয় যেতে হত। সেই সমস্যা দূর করতেই কল্যাণীতে নতুন সাংসদ কার্যালয় চালু করলেন তিনি।শনিবার কল্যাণীর নিমতলা এলাকায় একটি শপিং মলের কাছে এই কার্যালয়ের উদ্বোধন করেন শান্তনু। অনুষ্ঠানে শতাধিক দুঃস্থ ও অসহায় মহিলার হাতে শাড়ি তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য হুইলচেয়ারও দেওয়া হয়।অনুষ্ঠান শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন সাংসদ কার্যালয় থেকে এলাকার সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এর পরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শান্তনু বলেন, খুব তাড়াতাড়ি গ্রেফতার হতে পারেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।উল্লেখ্য, ৭ নভেম্বর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে শুক্রবার রাত থেকেই কালীঘাটে তাঁর বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন অনুগামীরা। সেই সময় কয়েক জন বিজেপি কর্মী-সমর্থক কালীপ্রতিমা নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে দাবি। তাঁদের সঙ্গে অভিষেকের অনুগামীদের বচসা শুরু হয়।অভিযোগ, অভিষেককে লক্ষ্য করে চোর স্লোগান দেওয়া হয়। ছিঁড়ে ফেলা হয় তাঁর ব্যানার ও কাটআউট। এর প্রতিবাদ করতে গেলে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। দুপক্ষকে সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা।এর পরেই বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন অভিষেক। তাঁকে দেখতে পেয়ে ফের স্লোগান দিতে শুরু করেন দুপক্ষের লোকজন। পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এলাকায় পুলিশকর্মীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়।অভিষেক কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বাড়ির নীচে বসে পড়েন। নিরাপত্তার কথা ভেবে পুলিশ তাঁকে বাড়ির ভিতরে চলে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। পুলিশের সঙ্গে তাঁর বচসাও হয়। অভিষেকের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই তাঁকে মারধর করা হয়েছে।শুক্রবার রাতের ঘটনার রেশ গড়ায় শনিবারেও। দুপুরে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাতে মাইক নিয়ে দুবার বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন তিনি। বিজেপি ও পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন।এই পরিস্থিতিতে শান্তনু ঠাকুরের মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়েছে। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতারের বিষয়ে কোনও সরকারি ঘোষণা বা নিশ্চিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
কলকাতা

আমার ওপর দিয়ে বুলডোজার চালাতে হবে! অভিষেকের বাড়ির সঙ্গে হুঙ্কার মমতার

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে উত্তেজনা ও হামলার অভিযোগ ঘিরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার দুপুরে কালীঘাটে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী জোটে থাকার কারণেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে ইচ্ছাকৃত ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। নাম না করে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীকেও নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী।৭ নভেম্বর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে শুক্রবার রাত থেকেই তাঁর বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন অনুগামীরা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, সেই সময় কয়েক জন বিজেপি কর্মী-সমর্থক কালীপুজোর প্রতিমা আনতে যাচ্ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে অভিষেকের অনুগামীদের বচসা শুরু হয়। পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।অভিযোগ, অভিষেককে লক্ষ্য করে চোর স্লোগান দেওয়া হয়। তাঁর ব্যানার ও কাটআউটও ছিঁড়ে ফেলা হয়। এর প্রতিবাদ করতে গেলে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। দুপক্ষকে সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা।এর পরেই বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন অভিষেক। তাঁকে সামনে দেখে ফের স্লোগান দিতে শুরু করেন দুপক্ষের লোকজন। পাল্টা স্লোগানেও উত্তেজনা বাড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় আরও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।অভিষেকও কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বাড়ির সামনে বসে পড়েন। নিরাপত্তার কথা ভেবে পুলিশ তাঁকে বাড়ির ভিতরে চলে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তাতে রাজি হননি তিনি। পুলিশের সঙ্গে তাঁর বচসাও হয়। অভিষেকের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই তাঁকে মারধর করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শনিবার ভোর ৬টা নাগাদ তিনি বাড়ির ভিতরে যান।এই ঘটনার পর শনিবার দুপুরে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা এলাকায় তখন প্রচুর পুলিশ মোতায়েন ছিল। সেখানে দাঁড়িয়েই কালীপুজোর আগে পরিকল্পিত ভাবে অশান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।মমতার অভিযোগ, পুরনো ক্লাবগুলির পুজোর আয়োজন করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ রাতারাতি নতুন নতুন পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। এমনকি অভিষেকের বাড়িতে ঢোকার পথ আটকে নতুন করে পুজোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে আইন মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু তাঁকে অকারণে হেনস্থা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। এই ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে প্রতিবাদে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। নাম না করে শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করে তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে এ ভাবে কাউকে হেনস্থা করা উচিত নয়।অন্য দিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মমতা ও অভিষেককে পাল্টা আক্রমণ করেছেন বরানগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তাঁর দাবি, বিরোধী জোট বলে বাস্তবে কিছু নেই। তাই সেই জোটে থাকার কারণে অভিষেকের বাড়িতে হামলা হয়েছে, এমন অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই বলেই মনে করেন তিনি।রাতের বেলা রাস্তায় কেন জন্মদিন পালন করা হচ্ছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিজেপি বিধায়ক। ফলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতর আরও বেড়েছে।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
কলকাতা

‘কালীঘাট থানার পুলিশ বাধা দিলে...’, কালীপুজোর আগে বিস্ফোরক মমতা, পাল্টা তোপ বিজেপির

কালীপুজোর আগের দিন ফের উত্তপ্ত কালীঘাট। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন পালনকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত থেকে তাঁর বাড়ির সামনে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায়। শনিবার সেই ঘটনার প্রতিবাদে পথে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিলেন তিনি। এমনকি কালীঘাট থানার পুলিশ বাধা দিলে কালীঘাট মন্দিরের সামনে পুজো করার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। অন্য দিকে, মমতা ও অভিষেকের বিরুদ্ধে অশান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে বিজেপি।শুক্রবার রাতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর বাড়ির সামনে জমায়েত করেছিলেন অনুগামীরা। অভিযোগ, রাস্তা আটকে জন্মদিন পালনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। এর পর থেকেই অভিষেকের বাড়ির সামনে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায়। দুপক্ষের মধ্যে বচসা ও হাতাহাতির অভিযোগও ওঠে।শনিবার এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন মমতা। হাতে হ্যান্ড মাইক নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে কথা বলেন তিনি। পাশে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রাস্তা ফাঁকা রাখার জন্য সকলের কাছে আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, যাঁরা অভিষেককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আসছেন, তাঁদের স্বাগত। তবে কাউকে রাস্তা আটকে জমায়েত করা যাবে না। প্রতিমা নিয়ে যাতায়াতের জন্য রাস্তা খোলা রাখতে হবে।মমতা বলেন, সবাইকে অনুরোধ করব, রাস্তা ফাঁকা করে দিন। তাঁর অভিযোগ, শুক্রবার রাতে পরিকল্পিত ভাবে অশান্তি তৈরি করা হয়েছে। মহিলাদের শাঁখা ভাঙার অভিযোগও তোলেন তিনি।পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। কালীঘাট থানার পুলিশ বাধা দিলে কালীঘাট মন্দিরের সামনে পুজো করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। পাশাপাশি অভিষেকের বাড়ির সামনে লাগানো ব্যারিকেড সরানোর দাবিও জানান। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দের পদত্যাগও দাবি করেন মমতা।মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এক দিকে হামলা চালানো হচ্ছে, অন্য দিকে মামলা করা হচ্ছে। বিজেপিকে নিশানা করে তিনি বলেন, এ ভাবে চলতে থাকলে এক দিন দলটি রাজনৈতিক ভাবে বড় সমস্যায় পড়বে। তাঁর দাবি, এ ভাবে অশান্তি তৈরি করে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়াই করবেন বলেও জানান তিনি।অন্য দিকে, মমতার অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে বিজেপি। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের দাবি, রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সময় তৃণমূলই কালীপ্রতিমা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল। এখন ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই অশান্তির পরিবেশ তৈরি করছেন বলে অভিযোগ তাঁর।দেবজিৎ আরও দাবি করেন, অভিষেকের জন্মদিনে কেক কাটা নিয়ে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত। কে কেক কাটবেন, তা নিয়েই দুপক্ষের মধ্যে গোলমাল শুরু হয় বলে তাঁর অভিযোগ। তাঁর মতে, এই ঘটনার জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই দায়ী।বরানগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষও মমতা ও অভিষেককে আক্রমণ করেছেন। তাঁর দাবি, বিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার কারণে অভিষেকের বাড়িতে হামলা হয়েছে, এমন অভিযোগ ঠিক নয়। কারণ, তাঁর মতে, বিরোধী জোটের বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। রাতে কেন রাস্তার উপর জন্মদিন পালন করা হল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।এ দিকে, শুক্রবার রাতের ঘটনার পর থেকেই অভিষেকের বাড়ির সামনে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বসানো হয়েছে ব্যারিকেডও।কালীঘাটে এই উত্তেজনার জেরে সমস্যায় পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। অভিযোগ, রাস্তা বন্ধ থাকায় দোকানদারদের ক্ষতি হচ্ছে। কালীপ্রতিমা বিক্রেতারাও ক্রেতাদের কাছে প্রতিমা পৌঁছে দিতে পারছেন না। ফলে কালীপুজোর মুখে কালীঘাটের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তৃণমূল ও বিজেপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রাজনৈতিক উত্তাপও ক্রমশ বাড়ছে।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
কলকাতা

মমতার বাড়ির কালীপুজো ঘিরেও অশান্তি! কালীঘাটে রাস্তা আটকে পুজো, ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রীর বড় হুঁশিয়ারি

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে অশান্তির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বিতর্ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কালীপুজো ঘিরে। কালীঘাটে নিজের বাড়ির প্রবেশপথ আটকে নতুন নতুন কালীপুজোর আয়োজন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পুরনো ক্লাবগুলির পুজোর আয়োজনে বাধা দেওয়া হলেও রাতারাতি নতুন পুজো শুরু হচ্ছে। শনিবার দুপুরে এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় কালীঘাটে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। প্রয়োজনে আবার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়াই করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার মাঝরাতে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে কালীঘাটে তাঁর বাড়ির সামনে জমায়েত করেছিলেন অনুগামীরা। সেই সময় কয়েক জন বিজেপি কর্মী-সমর্থক কালীমূর্তি নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে অভিষেকের অনুগামীদের বচসা শুরু হয়। একে অপরকে লক্ষ্য করে স্লোগান দিতে থাকেন দুপক্ষের লোকজন।এর মধ্যেই অভিষেককে লক্ষ্য করে চোর স্লোগান দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ছিঁড়ে ফেলা হয় তাঁর ব্যানার ও কাটআউট। তা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুপক্ষের লোকজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়।তবে অভিষেকের অনুগামীদের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই তাঁদের হেনস্থা করা হয়েছে। সেই সময় পুলিশ কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।এই ঘটনার পর শনিবার দুপুরে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ঘিরে এলাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সেই সময়ও কালীঘাটে উত্তেজনা তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কালীপুজোর আগে পরিকল্পিত ভাবে এলাকায় অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে।মমতার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে যে ক্লাবগুলি কালীপুজোর আয়োজন করে আসছে, তাদের পুজো করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ রাতারাতি নতুন নতুন পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তাঁর বাড়িতে ঢোকার রাস্তাও কার্যত আটকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।এই পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, এ ভাবে অশান্তি চলতে থাকলে তিনি চুপ করে থাকবেন না। প্রয়োজনে আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। মমতার কথায়, আমি দরকার হলে আবারও সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়ব।অভিষেকের বাড়ির সামনে জন্মদিন পালন ঘিরে রাতভর উত্তেজনা এবং তার পর মমতার বাড়ির কালীপুজো নিয়ে নতুন বিতর্কপরপর এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কালীঘাটে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
দেশ

ইন্দিরার জরুরি অবস্থা নিয়ে বিস্ফোরক সোনিয়া! সঞ্জয় গান্ধীকে একা দায়ী করতে নারাজ, ফাঁস করলেন কী?

১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে দেশে জারি হয়েছিল জরুরি অবস্থা। ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সেই সময়কে আজও কালো অধ্যায় হিসাবে দেখা হয়। এ বার সেই জরুরি অবস্থা নিয়েই নতুন করে বিতর্ক উসকে দিলেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তাঁর দাবি, জরুরি অবস্থার সময় মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছিল ঠিকই, তবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সংবিধান মেনেই। পাশাপাশি, জরুরি অবস্থার সময় হওয়া সমস্ত ভুলের জন্য শুধু সঞ্জয় গান্ধীকে দায়ী করতে রাজি নন তিনি। তাঁর মতে, সেই পরিস্থিতি তৈরির পিছনে অনেক প্রবীণ নেতা ও আমলারও ভূমিকা ছিল।আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হতে চলেছে সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী বিলংগিং: আ জার্নি অফ লাভ। বই প্রকাশের আগে একটি সাক্ষাৎকারে জরুরি অবস্থা নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন তিনি।সোনিয়া বলেন, জরুরি অবস্থার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সেই সময় কত বড় ঘটনা ঘটেছিল। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই কাজ করা হয়েছিল সাংবিধানিক পদ্ধতি মেনেই। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সঞ্জয় গান্ধীর প্রসঙ্গও তোলেন সোনিয়া। তাঁর মতে, সেই সময়ের সমস্ত ঘটনার জন্য শুধু সঞ্জয়কে দায়ী করা ঠিক নয়। জরুরি অবস্থার সঙ্গে সঞ্জয়ের নাম জড়িয়ে থাকলেও, পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।সোনিয়ার দাবি, সেই সময় দেশে একের পর এক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটছিল। সরকারি দফতর ও বাসে আগুন লাগানো হচ্ছিল। বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি ছড়াচ্ছিল। এমনকি সরকারি আধিকারিক ও সেনাকর্মীদের নির্দেশ অমান্য করার আহ্বানও জানানো হচ্ছিল। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্দিরা গান্ধীকে প্রবল চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। একাধিক প্রবীণ নেতা ও আমলার তরফেও তাঁর উপর চাপ তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি সোনিয়ার।সেই সময় রাজীব গান্ধীও মায়ের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন সোনিয়া। তাঁর কথায়, রাজীব সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও অসন্তোষের কথা ইন্দিরা গান্ধীকে জানাতেন। শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেন।সোনিয়া আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৭৭ সালের মার্চে নিজেই লোকসভা নির্বাচনের ঘোষণা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সেই সঙ্গে তুলে নেওয়া হয়েছিল জরুরি অবস্থা। পরে জরুরি অবস্থার সময় হওয়া বাড়াবাড়ির জন্য প্রকাশ্যে অনুতাপও জানিয়েছিলেন ইন্দিরা। ক্ষমা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন সোনিয়া। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই সেই পরিস্থিতির অবসান হয়েছিল।একই সাক্ষাৎকারে গত ১২ বছরে বিজেপি সরকারের আমলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষতি হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন সোনিয়া। তাঁর এই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল।তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার কথা কি ভুলে গিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী? তাঁর বক্তব্য, সেই সময় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। প্রায় ২১ মাস পর, ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ তা তুলে নেওয়া হয়। সেই সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও তার প্রভাব নিয়ে দেশের রাজনীতিতে বিতর্ক এখনও অব্যাহত। সোনিয়া গান্ধীর নতুন মন্তব্যে সেই পুরনো বিতর্কই আবার সামনে এল।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
কলকাতা

পাস দুর্নীতি মামলায় নয়া মোড়! বাবার নাম করেই দায় এড়ালেন ইন্দ্রনীলের মেয়ে?

পুজোর প্রিভিউ পাস দুর্নীতি মামলায় আরও চাপে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক ইন্দ্রনীল সেন। তাঁর কসবার বাড়ি এবং চন্দননগরের বাংলোয় তল্লাশি চালাল লালবাজারের বিশেষ তদন্তকারী দল। শুধু তল্লাশিই নয়, ইন্দ্রনীলকে সঙ্গে নিয়েই দুই জায়গায় পৌঁছন গোয়েন্দারা। তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, দুই জায়গা থেকেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছে।লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রির অভিযোগের তদন্তে টাকা লেনদেন সংক্রান্ত বেশ কিছু নথির খোঁজ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সেই নথি ইন্দ্রনীলের বাড়িতে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সেই সূত্র ধরেই শুক্রবার তাঁকে কসবার বহুতলে নিয়ে যান তদন্তকারীরা। তাঁর উপস্থিতিতেই বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। এরপর ইন্দ্রনীলকে নিয়ে চন্দননগরের বাংলোয় পৌঁছন গোয়েন্দারা। সেখানেও চলে তল্লাশি।লালবাজারের এক কর্তার দাবি, এখনও পর্যন্ত পুজোর প্রিভিউ পাস দুর্নীতি মামলায় ১৫০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ তিনটি সংস্থার সঙ্গে এই লেনদেনের যোগ থাকতে পারে। ওই সংস্থাগুলির বেশ কিছু নথি ইন্দ্রনীলের বাড়িতে রয়েছে বলে জেরায় জানতে পারেন তদন্তকারীরা। সেই কারণেই কসবা ও চন্দননগরে তল্লাশি চালানো হয়। সূত্রের খবর, দুই জায়গা থেকেই বেশ কিছু নথি উদ্ধার হয়েছে।এর আগে বৃহস্পতিবার ইন্দ্রনীলের মেয়ে আভেরি সেনকে লালবাজারে তলব করা হয়েছিল। তাঁর দুটি সংস্থার সঙ্গে ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ একটি সংস্থার প্রায় সাড়ে ২২ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই লেনদেন কী কারণে হয়েছিল, তা জানতে আভেরিকে প্রশ্ন করেন গোয়েন্দারা। পুজোর প্রিভিউ পাস এবং পর্যটন দফতরের টেন্ডার সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দুটি সংস্থার নথিও খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা।জেরার মুখে আভেরি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা ইন্দ্রনীল সেন সব কিছু জানেন। এই বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁকে যা করতে বলা হয়েছিল, তিনি শুধু সেটুকুই করেছেন বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন তিনি।এর আগে ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দাকেও লালবাজারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সূত্রের খবর, তিনিও গোয়েন্দাদের জানিয়েছিলেন, তাঁর স্বামীই সব কিছু জানতেন। তিনি কিছু জানতেন না।অন্যদিকে, ইন্দ্রনীল সেনের দাবি, মাস আর্টের সেক্রেটারি ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে শুভই সমস্ত লেনদেনের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই যাবতীয় টাকা লেনদেন হত বলে দাবি করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। ইন্দ্রনীলের বক্তব্য, এই দুর্নীতির মূল মাথা শুভ। যদিও তাঁর এই দাবি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যেই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন শুভ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে লেনদেনের বিষয়ে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। এই মামলায় ইন্দ্রনীল-সহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন এবং দুর্নীতিদমন আইনের ধারাও যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬
কলকাতা

সাতসকালে পুকুরে স্নান করতে গিয়ে চমকে উঠলেন স্থানীয়রা! জলে ভাসছে মহিলার দেহ, বাগুইআটিতে চাঞ্চল্য

পুকুরের জলে ভাসছে এক মহিলার দেহ! সাতসকালে স্নান করতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে কলকাতার কাছে বাগুইআটির বাগুইপাড়া এলাকায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। পুকুর থেকে মহিলার দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। কীভাবে তাঁর মৃত্যু হল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। খুন, আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা, সব দিক খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বাগুইপাড়া এলাকার ওই পুকুরে নিয়মিত স্নান করতে যান অনেকে। শনিবার সকালে কয়েক জন বাসিন্দা সেখানে স্নান করতে গিয়েছিলেন। সেই সময়ই তাঁদের নজরে আসে পুকুরের জলে ভাসছে এক মহিলার দেহ। এমন দৃশ্য দেখে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দ্রুত খবর দেওয়া হয় বাগুইআটি থানায়।খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুকুর থেকে মহিলার দেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, মৃতার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা নন বলেই মনে করা হচ্ছে।তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগে ওই মহিলা জলে তলিয়ে গিয়ে থাকতে পারেন। পরে তাঁর দেহ জলের উপরে ভেসে ওঠে। তবে কীভাবে তিনি পুকুরে পড়লেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাঁর মৃত্যু কি দুর্ঘটনা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য আর জি কর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।পাশাপাশি মৃতার পরিচয় জানারও চেষ্টা চলছে। আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন পুলিশকর্মীরা। কেউ ওই মহিলাকে চিনতে পারেন কি না, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। কালীপুজোর আগের দিন সকালে পুকুর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় মহিলার দেহ উদ্ধারের ঘটনায় বাগুইপাড়া এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

নভেম্বর ০৭, ২০২৬

Ads

You May Like

Gallery

265-year-old "Mukhopadhyay House" in Bhavanandpur, Kalnar, played vermilion on Dasami during Durga Puja
BJP candidate Locket Chatterjee campaigned on the banks of the Ganges from Chandannagar Ranighat to Triveni Ghat wishing New Year.
A living depiction of history with a touch of color, everyone is enthralled by the initiative of the Eastern Railway
Sucharita Biswas actress and model on Durga Puja
Lord Kalabau came up in palanquin; Navapatrika walked towards the mandap - the puja started
On Sunday, the 'Hilsa festival' is celebrated in the city with great joy.
Check out who has joined Mamata's new cabinet
Take a look at the list of recipients at the Bangabibhushan award ceremony
If you are grassroots, you will get ration for free. Lakshmi Bhandar, Kanyashree, Swastha Sathi, Krishakbandhu, Oikyashree, Sabujsathi — you will get all.

Categories

  • কলকাতা
  • রাজ্য
  • দেশ
  • বিদেশ
  • রাজনীতি
  • খেলার দুনিয়া
  • বিনোদুনিয়া
  • সম্পাদকীয়
  • নিবন্ধ
  • ভ্রমণ
  • রাশিফল
  • টুকিটাকি
  • চিত্রহার
  • বিবিধ
  • ভিডিও

Company

  • About Us
  • Advertise
  • Privacy
  • Terms of Use
  • Contact Us
Copyright © 2026 Janatar Katha News Portal